পুরুষ মানুষ


5659494এক.

মনটা বিক্ষিপ্ত। পুরুষ মানুষের নির্যাতনমূলক কর্মকান্ড দিনে দিনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সমাজে যে বিশৃঙ্খলতা দেখা দেবে তাতে আগামী প্রজন্ম কঠিন বিপদে পড়তে বাধ্য। আমাদের দায়িত্ব হলো আমরা যে বিশ্বে, যে বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছি সেই বাংলাদেশের চেয়ে একটি ভালো বাংলাদেশ, একটি বিশ্ব আমাদের সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া। তবে পরিবারে পুরুষ মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা যেভাবে বাড়ছে সেটা চলতে থাকলে আমাদের যে দায়িত্ব সেটা পূরণ হবে না।

তাহলে উপায়?

আমাদেরকে এখনই সোচ্চার হতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এবং বিশ্ব পুরুষের একার নয়, এটা সব মানুষের। এটা যেমন পুরুষ মানুষের, তেমনি নারীদেরও। পুরুষ আর নারী উভয়েই মানুষ, একথা আমাদের সবসময় মনে রাখা দরকার। যারা ভুলে যাবে তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে হবে।

কিন্তু বাংলাদেশের সমাজে যেভাবে ঘুণেপোকা ধরছে সেটা কিন্তু ভয়ংকর। সত্‌ ও ন্যায়পরায়ন শাসকের অভাবে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে। আসুন কিছু সামাজিক চিত্র জেনে নেওয়া যাক।

দুই.

১৩ বছরের রায়হান তার মাকে বলল, “তুমি ভেবেছো শুধু বাবাই তোমাকে মারে। যাও খোঁজ নিয়ে দেখো তোমার বান্ধবীদেরও তাদের হাবিরা মারে।”

রায়হানের বাবা যেদিন প্রথম কান্তার গায়ে হাত তুলেছিল সেদিনও কান্তা এতোটা অবাক হয়নি। এতোটা কষ্ট পায়নি, যা আজকে সে পেলো। বেদনায় কান্তার ফর্সা মুখটা নীল হয়ে গেলো। চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগল। এই সন্তান সে পেটে ধরেছে। দশ মাস ধরে বয়ে বেড়িয়েছে। এতোটা কষ্ট সহ্য করে তাকে জন্ম দিয়েছে।

তিন.

কান্তা যেটা ভাবতে পারেনি সেটা আমি জানি। রায়হান বড় হয়ে তার বউকে পেটাবে। রায়হানের বোনকে তার স্বামী পেটালে সেটা রায়হান স্বাভাবিক ভাববে। নির্যাতনকারী পুরুষরা এমনই হয়। কারণ তাদের চিন্তা চেতনায় নারী নির্যাতন একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। আমার দুশ্চিন্তার কারণ সেটাই।

চার.

বউ পেটানোর ঘটনা বাংলাদেশের সমাজে বেড়ে যাচ্ছে। আজ থেকে ৪০ বছর আগেও বাংলাদেশে বউ পেটানোর ঘটনার হার এতোটা ছিল না। যতোটা এখন দেখা যাচ্ছে। কেউ যদি বলেন, আগেও এমন ছিল কিন্তু সেটা প্রকাশ পাইনি। আমি সেটা মানব না। ৮০ এমনকি ৯০ এর দশকেও পুরুষ মানুষেরা অনেক সমঝে চলেছে। কেন আগে নারী নির্যাতন বিশেষ করে বউকে নির্যাতন কম ছিল এখন বেড়েছে সেটা সামাজিক গবেষণার বিষয়। তবে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ আছে।

পাঁচ.

মোটা দাগে আমি মনে করি বাংলাদেশের সমাজে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিম্নগতির সঙ্গে সঙ্গে নারী নির্যাতন বেড়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি মানুষের অনাগ্রহও নারী নির্যাতন বাড়তে সহায়তা করেছে। ইসলামে নারীকে উচ্চতর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অন্য ধর্মেও নারীদের প্রতি সম্মান দেখানো হয়েছে। তবে নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে আমার মতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে যে দু’টি বিষয় সেগুলো হলো:

ক. বাংলাদেশের সমাজে আত্মকেন্দ্রিকতা কিংবা তথাকথিত স্বনির্ভরতার ক্রমাগত বৃদ্ধি। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রতাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমাদের সমাজে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে, এমনকি পরিবারগুলোর মধ্যে যোগাযোগও কমে যাচ্ছে। এদিকে, মানুষ প্রতিবেশীর সঙ্গেও যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। একই ভবনে বাস করলেও বছরের পর বছর একের সঙ্গে অন্যের দেখা হয় না। এমন দুরবস্থা দশ বছর আগেও ছিল না। আগে পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠরা কিংবা প্রতিবেশীরা স্বামী-স্ত্রীর কলহ মিটমাট করতে ভূমিকা রাখতে পারত কিংবা স্বামী স্ত্রী বৃহত্তর পারিবারিক পরিবেশ বা আবহে থাকার কারণে নিজেরাই নিজেদের সামলে রাখত সেই দিন গত হয়েছে। এটা শহর ও গ্রামে সবত্র‍র্ই।

(তবে কখনো কখনো বৃহত্তর পরিবার নারী নির্যাতনকে সমর্থন করে যেমনটা রায়হান সমর্থন করছে তার বাবাকে। আরেকটি ঘটনা নিচে উল্লেখ করলাম।)

খ. দ্বিতীয় কারণটি হলো অর্থকেন্দ্রিক সম্মান ও সামাজিক মূল্যবোধ। যার টাকা আছে তার যেন সব করার অধিকার আছে! সমাজ ও রাষ্ট্র সেটা মেনেও নিচ্ছে।

ছয়.

আমি এক দম্পতিকে চিনি যারা প্রেম করে বিয়ে করেছে। তাদের সংসারে যতোদিন অভাব ছিল ততোদিন পুরুষ মানুষটি নিজের ভেতরের পশুকে দমিয়ে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু যখনই তার হাতে পরিশ্রম ছাড়াই টাকা আসতে লাগল, তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা পশুটা বের হয়ে এলো। বউকে পেটানো ও মানসিক নির্যাতন করা তার কাছে খেলায় পরিণত হলো। এখানে উল্লেখ্য যে, তার এই নির্যাতনে তার মা ও বোনদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে। “স্বামীরা এক আধটু শাসন করেই।”- এই ধরনের কথা তারা প্রায়ই তাদের বাড়ির বউকে স্মরণ করিয়ে দেয়। খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো- নির্যাতনকারী পুরুষের বাবাও তার মাকে মারত। আবার তার মা তার বাড়িতে দেখেছে তার ভাইয়েরা তাদের বউকে পেটায়। ফলে, নির্যাতনকারী পুরুষের মা যেমন নিজের জীবনে নির্যাতিত হয়েছেন, নির্যাতিত হতে দেখেছেন সেকারণে তার কাছে তার ছেলের বউকে পেটানো স্বাভাবিক মনে হয়। আর মানসিক নির্যাতন সেতো তাদের কাছে ডালভাত। কিন্তু বিপদ হয়েছে মেয়েটির। কারণ মেয়েটির পরিবারে না দাদা বাড়িতে, না নানা বাড়িতে, না নিজের মা-বাবাকে এমনটা হতে দেখেছে। ফলে মেয়েটি কোনমতেই এটা মানতে পারছে না।

পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল তাই না? এই ঘটনা থেকে কি আমরা এই কথা কি বলব যে, নারী নির্যাতন বিষয়টি জেনিটিক্যাল? কিংবা পারিবারিক পরিবেশগত সমস্যা?

সাত.

একজন পুরুষ হিসেবে আমার মনটা যে অকারণে নয়, কারণেই বিক্ষিপ্ত সেটা নিশ্চয়ই আপনারা স্বীকার করবেন। তবে নারী নির্যাতনের মতো ভয়াবহ চিত্রটা আমি কিংবা আমার মতো পুরুষরা চাইলেই বন্ধ করতে পারব না। এজন্য দরকার নিবিড় সামাজিক পর্যবেক্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো পরিস্থিতিগুলোর গভীর বিশ্লেষণ। বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে চমত্‌কার সব আইন আছে। সেসব আইনের প্রয়োগও আছে। কিন্তু একথাও মনে রাখতে হবে যে, আইন নিজে নিজে কোন সমস্যার সমাধান করতে পারে না। নির্যাতিতকে আগে আইনের শরনাপন্ন হতে হয়। সমস্যা রয়েছে সেই জায়গাতেও। বেশিরভাগ নির্যাতিত নারী “পুরুষ মানুষ”কে আদালতে নিয়ে যেতে পারেন না। অনেক কারণেই সেটা হয়।

আট.

আমাদের পরিবার ও সমাজের আরেকটি বড় সমস্যা হলো নারীর শারীরিক নির্যাতনকে কেউ কেউ গুরুত্ব দিলেও; নারীর মানসিক নির্যাতন বেশিরভাগ সময় চোখের আড়ালে থেকে যায় কিংবা গুরুত্ব পায় না। আমার বোধ বুদ্ধি বলে, একজন মানুষের জীবনে শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও ভয়ংকর হলো মানসিক নির্যাতন। শারীরিক নির্যাতন অন্তরে যে রেখাপাত করতে পারে না, মানসিক নির্যাতন সহজেই সেটা করতে পারে।

একজন গৃহিনীকে তার স্বামী পুরুষ মানুষটি যখন বলে- দুই পয়সা তো কামাই করার মুরোদ নেই সংসারেরটা তো খেয়ে খেয়ে গায়ে গতরে ভালোই মোটা হয়েছো; তখন সেই গৃহিনী মেয়েটির নিশ্চয়ই মনে হয় মাটি তুই আমাকে কেন এখনো নিয়ে যাচ্ছিস না! খুব ভালো হতে পারত, যদি নির্যাতিত নারী ওই পুরুষ মানুষটির মুখে ভাতের হাড়ি ছুড়ে মেরে চলে আসতে পারত।

অনেক কারণেই নারী তার সংসার ছেড়ে চলে আসতে পারে না।

যেমন রায়হানের মা কান্তা খুব ভালো একটি চাকরি করে। মাস শেষে যা বেতন পায় সেটা তার চলার জন্য যথেষ্ট। তারপরও কান্তা রায়হানের বাবার মুখে কখনো কষে একটা চড় দিতে পারেনি, যা তার স্বামী তার মুখে বুকে পিঠে পায়ে হরহামেশা দিয়ে থাকে। হয়তো কান্তা তার পরিবারে সেই শিক্ষা পায়নি। কিংবা অন্য কোন অজানা কারণে কান্তা হাত গুটিয়ে থাকে।

নয়.

গত কয়েক বছর ধরেই একজন মানুষ হিসেবে আমি পুরুষ মানুষের এমন অনাচার প্রতিকারের উপায় নিয়ে ভাবছি। আজ এই রাতে মনে হলো আপনাদের সঙ্গে অল্প করে হলেও শেয়ার করি, যদি কোন উপায় বের হয়ে আসে।

বউ পেটানো ও মানসিক নির্যাতনকারী সেই সব বীর পুরুষদের প্রতি ঘৃণা ও নিন্দা জানাই। সেসঙ্গে আশা করছি যে, এই দেশে সত্‌ ও ন্যায়পরায়ন শাসক আসবে; যেই শাসকের শাসনে হারিয়ে যাওয়া সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধগুলো ফিরে আসবে। বিদ্যালয়ে নীতি ও নৈতিকতা শেখানো হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে। নির্যাতিতরা নির্ভয়ে আইনের শরণাপন্ন হতে পারবে। নির্যাতনকারীর উপযুক্ত শাস্তি হবে, তার কোন পরিচয় সেখানে কাজ করবে না।

দশ.

আমরা যেন আমাদের দায়িত্বের কথা ভুলে না যাই।
ঢাকা।। পল্লবী।।

২ মে ২০১৬।।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s