সংখ্যার খেলা : শুধু কি আমাকে অস্থির করে, আপনাকে নয়?


এক.

মানবিক উন্নয়ন থেমে গেছে। ইট পাথরের উন্নয়নের উন্নয়ন বেড়ে গেছে। যারা উন্নয়ন বুঝায়, তারা এখন সংখ্যা গোনে। আমি সংখ্যার উন্নয়নকে আদর করে বলি- নাম্বার গেইম। যার সরল বাংলা হলো- সংখ্যার খেলা।

উন্নয়নে যখন সংখ্যার খেলা হয় তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে- গড়। গড় আয়ু। গড় আয়। জিডিপি। ইত্যাদি শব্দ দিয়ে উন্নয়ন বোঝানো হয়। সেখানে গরিব মানুষের জীবনের কোন গুরুত্ব নেই।

তো এই সংখ্যার খেলায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রগতি, অগ্রগতি সবই ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে সমষ্টিকে তুলে ধরে সেখানে গরিব মানুষের কোন মূল্য নেই। আমি যখনই এসব ভাবি, অঙ্ক না মেলানোর অস্থিরতায় পেয়ে বসে আমাকে। আমার ঘুম হারাম হয়ে যায়। একটা কিছু করার জন্য আমার মন অস্থির হয়ে উঠে। কিন্তু এই মাটিতে ৪৭ বছর পার করে দিয়ে আমি ঠিকই জানি আমার কিছু করার নেই। কারণ আমি অতি সাধারণ একজন মানুষ। ক্ষমতার দিক থেকে গরিব একজন মানুষ। আমার মতো এমন লক্ষ লক্ষ ক্ষমতার দিক থেকে গরিব মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাবান একজন এমপি, মন্ত্রী। যারা বইয়ে পড়ে জনগণই দেশের মালিক মনে করে তারা ছেড়া কাথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখে। বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর।

বাস্তবতা হলো গরিবের জন্য কেউ নেই। সত্যিকারের বিপদে পড়লে গরিব টের পায়, সে আসলে কতোটা গরিব ও অসহায়। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসেবে ২৭ হাজার লোক মারা গিয়েছিল। অমর্ত্য সেনের এক বইয়ে সেই মৃতু্যর জন্য দায়ী করা হয়েছিল- ব্যবস্থাপনাগত সমস্যাকে। তারপর ৩২ বছর পার হয়েছে বাংলাদেশ ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা থেকে বের হতে পারেনি। উন্নয়নের সকল কিছুতে ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা।

রানা প্লাজা ধ্বসের পর ধারণা করা হয়েছিল এই দেশের শিল্প কারখানায় সুদিন ফিরবে। শ্রমিকদের ভাগ্যে করুণ মৃতু্যর দিন ফুরাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- ফিরেনি। সর্বশেষ এক সাবেক এমপির কারখানায় ঈদের আগে লাগা আগুন নেভেনি। শ্রমিকের লাশ উদ্ধারও পুরোপুরি হয়নি। কারণ ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা। ওই কারখানার নকশাই পাওয়া যাচ্ছে না উদ্ধার কাজ চালানোর জন্য।

বাংলাদেশের মানুষ খুবই লিবারেল। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আরো বেশি মুক্তমনা। সব দোষ নিজেদের ঘাড়ে টেনে নেয়। কিংবা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয়। একারণে তারা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও পায় না। ভাগ্য তো হেটে এসে ক্ষতিপূরণ দেবে না। উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেটা তারা নিতে পারে না। কারণ রাষ্ট্র তাদেরকে শ্রমিক হওয়ার মতো ক্ষেত্র প্রস্তুত করলেও নিজেদের অধিকার আদায়ের শিক্ষাটা দেয়নি। বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যা খুবই সাধারণ একটা চিত্র। ফলে, সংখ্যার উন্নয়ন নিয়ে রাষ্ট্র যখন তৃপ্তির ঢেকুর তোলে তখন শ্রমিকের ঘরে কান্নার রোল উঠে।

দুই.

পাঞ্জাবীদের অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম আমরা। জান কোরবান দিয়েছিল ৩০ লাখ প্রাণ। ২০০২ সালে উত্তরবঙ্গের ডালিয়াতে হাটবারে ২ টুকরো মাংস দিয়ে এক ভাগ, এভাবে গরুর মাংস বিক্রি হতে দেখেছি। সেসময়ে ঢাকার রাস্তায় কোটি টাকার গাড়ি ছুটে বেড়িয়েছে। ২০১৬ সালে সরকারিভাবে ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবারের ৩ কোটি গরিব মানুষের মুখে এক থালা ভাত পৌঁছে দিতে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করতে হচ্ছে। বছরে ৫ মাস প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল বিক্রি করে তাদের মুখে অন্তত ভাতটুকু তুলে দেওয়া হবে। সেই ভাত হয়তো তারা নুন দিয়ে খাবে। অথচ এখন ঢাকার রাস্তায় কোটি টাকার গাড়িতে যানজট লেগে যায়।

আর্থিকভাবে দেশ এগিয়েছে নিঃসন্দেহে। অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়েই গেছে। আগে হাজার মাইল দূরের পাঞ্জাবীরা শোষণ করত। স্বস্তির বিষয় হলো এখন বাড়ির কাছের নেতারা শোষণ করে। সবই আমরা আমরা। জান কোরবান দেওয়া ৩০ লাখ প্রাণ ফিরে আসবে না। তবে কি তাদের জীবন বৃথা গেলো? আগামীকাল ইসলাম ধর্মের মানুষেরা পশু কোরবানি দেব আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্যই আমাদেরকে দেশের মধ্যে বিরাজমান অর্থনৈতিক শোষণ দূর করতে হবে। নতুবা একদিন ঠিকই প্রশ্ন উঠবে- ৩০ লাখ শহীদ কেন জান কোরবান দিলো?

আসুন, আধুনিক কালের পাঞ্জাবীদের অর্থ‍র্নৈতিক শোষণের অবসানে সবাই মিলে কাজ করি। নিজে দুই টুকরো মাংস খেলে অন্তত একটা টুকরো যেন গরিব প্রতিবেশী/যাদের পাওয়ার কথা তারা পায় সেটা নিশ্চিত করি।

সবাইকে ঈদ মোবারক!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s