বাংলাদেশের সত্‌ ও কর্মঠ তরুণ-তরুণীরা কষ্টে আছে


আমার পরিচিতদের কেউ কেউ বিভিন্ন কাজে আমার পরামর্শ চায়। আমিও সাধ্যমতো তাদেরকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করি। আজকে একজন আমাকে ফোন দিয়েছিল। ৩১ বছর বয়সী এক তরুণ। তার স্ত্রী ও এক সন্তান আছে। তার ছোট চাচা অনেক বছর ধরে মালয়েশিয়া থাকে। সম্প্রতি ছোট চাচার কোম্পানি আরো ৩০০ লোক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আলোচ্য তরুণও যেতে চায়। কিন্তু সে বুঝে উঠতে পারছে না, তার এই যাওয়াটা ঠিক হবে কিনা? সেকারণেই আমাকে ফোন দিয়েছিল।

আমি সাধারণত পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতি অনুসরণ করি। এই পদ্ধতিতে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটি বিষয়ের ভালো মন্দ বিচার বিশ্লেষণ করা হয়। করা হলে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে। সেই সব সুবিধা পাওয়ার জন্য কী কী ধরনের অসুবিধা বা চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। ইত্যাদি। এক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করলাম।

আলোচনার সুবিধার জন্য ধরা যাক যে বিদেশে যেতে চায় তার নাম প্রত্যয়। আমি প্রত্যয়কে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলাম সেকি পুরো বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখেছে? বর্তমানে সে যে কাজ করছে সেই কাজের আয় ও ভবিষ্যত এবং মালয়েশিয়াতে গিয়ে সে যা করবে সেই কাজ ও সেখানকার জীবন এসব কিছু নিয়ে সে কি তার চাচার সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে কিনা? উত্তরে প্রত্যয় জানালো সে সবকিছু খোঁজখবর নিয়েছে। আমি তখন তার কাছ থেকে সব কিছু জানলাম। বিষয়টি হলো- বাংলাদেশে প্রত্যয় যে কাজ করছে ওখানে গিয়ে তাকে প্রায় কাছাকাছি ধরনের কাজ করতে হবে। তার কাজের সময় হবে প্রতিদিন সকাল ৮ থেকে বিকেল ৫টা, দুপুরে ১ ঘণ্টা বিরতি। এই হিসেবে প্রতিদিন সে ৮ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ৬ দিন এবং মাসে ৪ সপ্তাহ কাজ করার জন্য বাংলাদেশী টাকায় (বর্তমানের রেট অনুযায়ী) ১৮,৭০০ টাকা পাবে প্রতিমাসে। এছাড়াও তাকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে ওভারটাইম কাজ করতে হবে। ফলে তার মাস শেষে বেতন দাড়াবে ২৩,৩৭৫ টাকা। তার রোববার ছুটি। ওইদিন যদি কাজ করতে পারে তাহলে সে প্রতি ঘণ্টায় অন্যান্য দিনের ঘণ্টা প্রতি কাজের দ্বিগুণ পাবে। প্রতি ছয়মাস অন্তর তার বেতন বাড়বে ৫০ রিঙ্গিত করে। তবে পারফরমেন্স ভালো হলে তার বেতন বাড়বে ১০০ রিঙ্গিত। তার চাচা তাকে ধারণা দিয়েছে সে যেরকম পরিশ্রমী ছেলে তাতে মাসে সে মোটামুটি ৩০ হাজার টাকা আয় করতে পারবে। তার সঙ্গে কোম্পানির চুক্তি হবে ৫ বছরের। সেই হিসেবে তার ৫ বছরে আয় হবে কম বেশি ১৮ লাখ টাকা। এবার হলো খরচের হিসেব। প্রতি মাসে খাওয়া ও থাকা খরচ হবে কমপক্ষে ৫,০০০ টাকা। যেহেতু ফ্যাক্টরির কাছেই থাকার ব্যবস্থা আছে ফলে যাতায়াতের জন্য কোন খরচ হবে না। প্রত্যয় জানালো তার মালয়েশিয়ায় ওয়ার্ক পারমিট ও অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি এবং বিমান ভাড়া বাবদ মোট ৩ লাখ টাকা খরচ হবে। তারমানে ৫ বছরের হিসেবে প্রতিমাসে তার খরচ হলো ৫,০০০ টাকা। যেহেতু প্রত্যয় বিবাহিত এবং তার স্ত্রী ও সন্তান বাংলাদেশে থাকবে ফলে তাকে প্রতিমাসে বাবার সংসারে কমপক্ষে ৫,০০০ টাকা পাঠাতে হবে। তারমানে দাঁড়ালো মোটা দাগে তাকে কমপক্ষে ১৫,০০০ টাকা মাসে খরচ করতে হবে। যদি সে প্রতি বছর একবার করে দেশে আসে তাহলে তাকে যাতায়াত খরচ ও সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের জন্য টুকিটাকি গিফট আনার জন্য ব্যয় করতে হবে অন্তত ৫০ হাজার টাকা। তারমানে প্রতি মাসে আরো প্রায় ৪ হাজার টাকা। এছাড়া তার কাপড় চোপড়, অসুখ বিসুখে খরচ, বিনোদন খরচ ইত্যাদি যদি মাসে গড়ে কমপক্ষে ১০০০ টাকাও হয় তাহলে দেখা যায় যে, তার মাসে খরচ হচ্ছে ২০,০০০ টাকা। আর তার আয় হলো ওভারটাইমসহ ৩০,০০০ টাকা। মাসে ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় ধরলে ৫ বছরে জমা হবে ৬ লাখ টাকা। এখানে তার আয় যেমন সর্বোচ্চ ধরা হয়েছে, ব্যয় ধরা হয়েছে সর্বনিম্ন। অবশ্য প্রত্যয় বলল, প্রতিবছর দেশে না এসে ৫ বছরে ২ বার এসে সে আরো অন্তত দেড় লাখ টাকা বাঁচাতে পারে। আমি যদিও তার ছোট শিশু সন্তান ও স্ত্রীকে রেখে এভাবে ৫ বছরে মাত্র দুবার আসার ইচ্ছেকে সমর্থন করি নাই। কিন্তু আলোচনার সুবিধার্থে তার জমা হওয়া ৬ লাখ টাকার সঙ্গে ওই দেড় লাখ টাকাও যোগ করলাম। তাহলে দাড়ালো সাড়ে ৭ লাখ টাকা। প্রত্যয়ের ৫ বছরে সঞ্চয় হবে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। এবার আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম বর্তমানে বাংলাদেশে সে যে কাজ করছে সেখানে গত ২ বছরে তার গড় আয় কতো? বলল ১৫ হাজার টাকা। তারমানে এই রেটেও যদি সে আয় করে তাহলে তার ৫ বছরে মোট আয় হবে ৯ লাখ টাকা। যা তার মালয়েশিয়ার আয়ের অর্ধেক। তাকে আমি তখন বললাম সে যদি মালয়েশিয়ায় গিয়ে বাবার যৌথ সংসারে মাসে ৫,০০০ টাকা দেয় তাহলে এখন কতো দিচ্ছে? বলল এখনো সে ৫,০০০ টাকাই দিচ্ছে। বেশ। তাহলে তো তার হাতে মাসে ১০,০০০ টাকা থাকে। এই হিসেবে তো তার সঞ্চয় ৫ বছরে ৬ লাখ টাকা। সে বলল তা থাকে না। কারণ বিভিন্ন ধরনের খরচ আছে। ফলে বছরে তার হাতে তেমন টাকা কড়ি তেমন জমে না। আমি তখন তাকে বললাম সে যখন বিদেশে থাকবে তখন পরিবারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ফলে, এখন সে যেমনটা মনে করছে সেভাবে ৫ বছরে তার টাকাকড়ি জমা হবে না। এখানে আরো লক্ষণীয় হলো তাকে যাওয়ার জন্য ৩ লাখ টাকা ধার করতে হবে। এই ৩ লাখ টাকা যদি সে ব্যাংকে রাখে তাহলে তার মাসে অন্তত আড়াই হাজার টাকা আয় হবে তারমানে ৫ বছরে দেড় লাখ টাকা। এভাবে সামগ্রিক বিচারে তার আয় যদি বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে ১৫,০০০ টাকা কনটিনিউ করে এবং কিছুটা বাড়ে তাহলে মালয়েশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশেই তার থাকা ভালো। সবচেয়ে বড় কথা হলো- সন্তানের বেড়ে উঠার এই সময়টায় মা-বাবা উভয়রে কাছে থাকার প্রয়োজন আছে। তদুপরি বিবাহিত স্ত্রীকে এভাবে ৫ বছর একাকী বাবার বাড়িতে রেখে যাওয়াটাও সমীচিন নয়। সবমিলিয়ে যুক্তির খাতিরেও যদি বলি ৫ বছরে তার হাতে যে সাড়ে ৭ লাখ টাকা জমা হবে তার বিনিময়ে তার সন্তান ও স্ত্রী তার সঙ্গ হারাবে যার মূল্য ওই টাকার চেয়ে বেশি। আমি জানি না শেষ পর্যন্ত প্রত্যয় মালয়েশিয়ায় যাবে কি যাবে না।

এই ধরনের সমস্যায় আটকে আছে এই দেশের লাখো তরুণ-তরুণী। মাসে ২/৪ হাজার টাকা বাড়তি আয় করার জন্য তারা পরিবার পরিজন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। অনেকে বৈধ পথে। অনেকে অবৈধ পথে। তাদের সেই সব সংগ্রামমুখর জীবনে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের যে ভূমিকা পালনের কথা ছিল সেটি নেই। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে রাষ্ট্র না পেরেছে বিদেশে স্বল্প খরচে চাকরির ব্যবস্থা করতে না পেরেছে দেশের মধ্যে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান করতে। প্রত্যয় মালয়েশিয়ায় যদি ৩ লাখ টাকার পরিবর্তে ১ লাখ টাকায় যেতে পারত এবং সেখানে যদি সে দৈনিক ৮ ঘণ্টা পরিশ্রমে দিনে ৭০০ টাকার পরিবর্তে অন্তত ১০০০ টাকা আয় করতে পারত তাহলে ৫ বছর পরে তার হাতে অন্তত ১৫ লাখ টাকা সঞ্চয় হতো যা সে বাংলাদেশেই পাঠাতো। মুশকিল হলো জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে আমাদের দেশের পূর্বাপর সরকারসমূহ যতো কথা বলেছে বাস্তবে তার কানাকড়ি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে যারা বিদেশে গিয়েছে কিংবা যাচ্ছে তারা নিজ উদ্যোগেই যাচ্ছে। যা ব্যয়বহুল। এভাবেই বাংলাদেশের সত্‌ ও পরিশ্রমী তরুণ-তরুণীরা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। তারা কোনমতে বেঁচে থাকছে। সেটা শহরে ও গ্রামে।

পল্লবী। ঢাকা।
২৮ মে ২০১৭

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s