পাহাড়ে তিন দিন: “ভালো থাকুন মা, বাংলাদেশে!”


১ এপ্রিল ২০১২
গন্তব্য: রাঙামাটি
সঙ্গী: ড. ভ্যালেরি এমব্লেন, টিম লিডার, শেয়ার টিএ

এয়ারপোর্টের টার্মিনালে ঢুকেই ভ্যালেরিকে খুঁজলাম। না আসেনি। খুঁজতে গিয়ে পরিচিত একজনকে দেখলাম। একবার মনে হলো গিয়ে কথা বলি। কিন্তু তিনি তার পাশের ভদ্রলোকের সঙ্গে যেভাবে জমিয়ে কথা বলছেন, মনে হলো এই সাত সকালে অনেক বছর আগের পরিচয়ের সূত্র ধরে কথা বলাটা ঠিক হবে না। তার সঙ্গে পরিচয় ভোরের কাগজে; আমি তখন ভোরের কাগজে মেলায় লেখালেখি করি। মেলার সম্পাদক ছিলেন মিটুন ভাই (আনিসুল হক)। মেরিনা আপা (মেরিনা ইয়াসমিন) ভোরের কাগজের স্টাফ ছিলেন। সে প্রায় ১৪/১৫ বছর আগের কথা। এরপর অবশ্য ৫/৬ বছর আগে মেরিনা আপার সঙ্গে কয়েক মুহুর্তের জন্য দেখা হয়েছিল আমেরিকান সেন্টারের ডাইনিংয়ে। মেরিনা আপা তখন সেখানে কাজ করেন। এক ঝলকে মনে হলো মেরিনা আপা যার সঙ্গে কথা বলছেন তাকেও আমি চিনি। খুব সম্ভবত মি. ফিরোজ আহমেদ। কেউ একজন ফিরোজ ভাই বলে ডাক দেওয়াতে পরে নিশ্চিত হয়েছিলাম, তিনিই সাংবাদিক ফিরোজ আহমেদ। তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল সাংবাদিক মি. মাসুদ মজুমদারের অফিস কক্ষে। সময়টা সম্ভবত ১৯৮৭/৮৮ হবে। এরপর সর্বশেষ দেখা হয়েছিল জীবন বীমা টাওয়ারের অবস্থিত স্বল্পকালীন সময়ের জন্য বের হওয়া ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফের অফিসের বারো তলায়। সেই দিনটার কথা মনে আছে। সন্ধ্যার কিছুটা পরে ১২ তলা থেকে আমি রাতের ঢাকা দেখছিলাম এক ভালো লাগা নিয়ে। এক কাপ চা খেয়েছিলাম আর আলাপ হয়েছিল বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। তার কিছুদিন পরেই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে জানতে পেরেছি ফিরোজ ভাই আমেরিকান অ্যাম্বাসেতি পলিটিক্যাল অ্যাসিটেন্ট পদে যোগদান করেছিলেন। মেধাবী ফিরোজ ভাই এতোদিনে নিশ্চয়ই অনেক উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। এই সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ভ্যালেরি চলে এলো। আমরা টুকটাক কথাবার্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। প্লেনে উঠার পর আমাদের আলোচনায় চলে এলো আমেরিকান অ্যাম্বাসেডর। আমি ভ্যালেরিকে বললাম, তোমার সঙ্গে আমেরিকান অ্যাম্বাসেডরও যাচ্ছেন। ভ্যালেরি বলল, ও তাই নাকি? কোথায়?

বললাম, ‘তোমার কলামের সিটের একদম সামনের সিটে।’ সেসঙ্গে একথাও বললাম, ‘ভ্যালেরি আমার কি মনে হচ্ছে জানে, অ্যাম্বাসেডরও রাঙামাটি যাবেন এবং সেখানে প্রেস কনফারেন্স করবেন। কিছু পলিটিক্যাল বিষয়াদি নিয়েও আলাপ হবে।’

তার সঙ্গে কাজের শুরু থেকেই খেয়াল করেছি ব্রিটিশ নাগরিক ড. ভ্যালেরি আমাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। আমার কথায় সে তার বিরক্তি লুকাতে পারল না। বলল, “এটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের কল্পনা হয়ে গেল না?”

তার বিরক্তিতে আমি খুব মজা পেলাম। বললাম, ‘পুরোটা কল্পনা নয়। কিছুটা অঙ্ক। কিছুটা আন্দাজ।”

ভ্যালেরির বিরক্তি চরমে গেলো। বলল, “আমরা চিটাগং যাচ্ছি। সেখানে থেকে অনেক জায়গায় যাওয়া যায়। তুমি বলে দিলে আমেরিকান অ্যাম্বাসেডরও রাঙামাটি যাবে, প্রেস কনফারেন্স করবে, পলিটিক্যাল বিষয়াদি নিয়ে আলাপ করবে। আর এগুলো তুমি অঙ্ক করে বের করেছো?”

হাজার হলেও টিম লিডার। খুব বেশি খেপানো ঠিক হবে না ভেবে হালকা করে ব্যাখ্যা করলাম। অঙ্কটা কি আর আন্দাজটা কিভাবে করলাম। মনে হলো ব্যাখ্যা তার খুব একটা পছন্দ হয়নি। তবে অঙ্কটা যে সে পুরোপুরি ফেলে দিতে পারেনি, সেটাও বুঝলাম।

দুই.

চিটাগাংয়ের জ্যাম পেরিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা জার্নি করে রাঙ্গামাটির পর্যটনে যখন পৌঁছলাম তখন বাজে সাড়ে বারোটা। ভ্যালেরি ও আমি দু’জনেই রিসিপশনে আগমনী কার্ড পূরণ করছি। লিখতে লিখতে শুনলাম ফ্রন্ট ডেস্ক কর্মকর্তা ফোনে বলছেন, ‘রুম তো ফিরোজ সাহেবের নামে মাত্র ২টা বুক করা হয়েছে। এখন আরো দুইটা রুম দেওয়া যাবে কিনা সেটা খাতা না দেখে বলতে পারব না। … হ্যা, আমেরিকান অ্যাম্বাসির নামেই বুক করা হয়েছে। কিন্তু এখন রুম খালি না থাকলে কিভাবে দেব।… আমরা তো জানি না যে অ্যাম্বাসেডর আসবেন।…দাড়ান দেখছি। …মনে হয় আরো দু’টা রুম দিতে পারব তবে সেগুলো নন এসি হবে।… এসি রুম যদি খালি হয় তখন দিতে পারব। এখন পর্যন্ত জানি না এসি রুম খালি হবে কিনা …জি আরো ভালো ভাবে দেখে বলতে হবে। …ঠিক আছে আপাতত দুটো রুমের কথা লিখে রাখলাম।’

ড. ভ্যালেরি এর আগেও বাংলাদেশে কাজ করে গিয়েছে। বাংলা খুব ভালো বুঝতে পারে ও বলতে পারে। আমি জানি আমার মতো ভ্যালেরিও ফ্রন্ট ডেস্ক কর্মকর্তার কথাগুলো শুনেছেন। আমি ভ্যালেরি দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ হাসি দিলাম! সে বলেই ফেলল, “হ্যা, তোমার কথাই ঠিক। কিন্তু তুমি বুঝলে কিভাবে?”

আমি মুচকি হেসে বললাম, ‘ইনটুইশন’।

তিন.

পর্যটনের এই হোটেলে আমি আগেও অনেকবার থেকেছি। তারমধ্যে অন্তত দু’বারের ঘটনা আমার মনে থাকবে চিরকাল। একবার রাত ১০/১১টার দিকে অনেক মানুষের চিত্‌কার চেচামেচি শুনলাম। রুম থেকে বের হয়ে বারান্দায় দাঁড়াতেই দেখি দূরে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যাচ্ছে। মানুষের আর্তচিত্‌কার সেখান থেকেই আসছে। হোটেল স্টাফদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম ওটা পাহাড়িদের এলাকা, সেখানে আগুন লেগেছে। অথবা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। কতোসালের ঘটনা হবে সেটা? ১৯৯৯ কিংবা ২০০০ সাল। আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায়। পরদিন সকালে ঘটনাটি জানার চেষ্টা করলাম কিন্তু দেখলাম রাতের আগুন নিয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজী নয়। এক ধরনের নিষিদ্ধ বিষয় মনে হলো। পরের ঘটনাটি ২০০২ কিংবা ২০০৩ সালের। তখন ক্ষমতায় বিএনপি। ঢাকা থেকে গাড়ি নিয়ে রাঙ্গামাটি গিয়েছি। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। রাতে খাওয়ার পর খেয়াল করলাম পুরো পর্যটন এলাকাটা কেমন যেন থমথমে। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম ঠিক পর্যটন এলাকার মধ্যে নয়, গত পরশু কাছাকাছি একস্থান থেকে একজন বাঙালিকে পাহাড়িরা ধরে নিয়ে গেছে। সেনিয়ে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। এই খবরের মধ্যেই আরো জানলাম যে, আজকে পর্যটন হোটেলে আমরা দু’জন মাত্র গেস্ট। ওই রাতে ঘুমাতে পারিনি। বার বার মনে হচ্ছিল এই বুঝি কেউ এসে ধরে নিয়ে গেলো। যদিও তখনও পর্যন্ত পর্যটন এলাকার মধ্য থেকে এই ধরনের কোন অঘটন ঘটেনি। যাই হোক সকালে নিজেকে বোকা বোকা লাগছিল।

আজকে আমাকে যে রুমটা দেয়া হলো সেটা সেই ভয় ধরানো রাতের রুমের উল্টোদিকে। আগের রুমটা ছিল সিড়ি দিয়ে উঠে ডানের শেষ মাথায়। এবারের রুমটা সিড়ি দিয়ে উঠে হাতের বায়ে। রুম নাম্বার ২১১। শেষ রুমটা ২১২। ওটা ড. ভ্যালেরির।

চার.

রুমে ঢুকে প্রথমেই রুটিন চেকআপটা সেরে নিলাম। অনেক দিনের অভ্যাস। প্রথমেই দেখলাম টয়লেটে টিসু পেপার, টাওয়েল, সাবান ইত্যাদি আছে কিনা। দেখলাম বেসিনের উপর কাঁচের সেলফে দুটা টুথব্রাশও দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে পেস্ট। পর্যটন হোটেলে এবারই প্রথম টুথব্রাশ দিতে দেখলাম। দু’টা টুথব্রাশ দেওয়ার কারণ আমি যে রুমটা নিয়েছি সেটা ডাবল অকুপেন্সি রুম। আমার দেখা শুধু রাজশাহী ছাড়া বাকি পর্যটন হোটেলগুলোতে তখন পর্যন্ত সিঙ্গেল রুম ছিল না। যাই হোক, বাথরুমে সবকিছুই ঠিকঠাক মতো পেলাম। টিভির রিমোটও পেয়ে গেলাম। এসির সুইচটা অন করতে যেভাবে ঝাঁকি দিয়ে চালু হলো মনে হলো এটা থেকে ঠাণ্ডা কিছু বের হবে কিনা সন্দেহ। যদিও পরে সেই ধারণা ভুল হয়েছিল। টিভি ছেড়ে স্থানীয় চ্যানেলে দেখি লোকাল বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। সেসঙ্গে ব্যাক গ্রাউন্ডে মিউজিক। বাথরুমের দরজা খুলে গোসলে ঢুকে গেলাম। গান শুনতে শুনতে গোসলটা সেরে নিলাম। গোসল সেরে বের হয়ে দেখি আমার হাতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট আছে। অবশ্য খেতে যাওয়ার জন্য রেডি হওয়ার কিছু নেই। দোতলা থেকে শুধু নিচতলায় নামতে হবে। টিভি, এসি বন্ধ করে রুম লক করে নিচে নেমে এলাম। টেবিল বাছাই করে বসলাম। কিছুক্ষণ পর ড. ভ্যালেরি এসে যোগ দিলেন।

পাঁচ.

পর্যটনে খাবারের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। আর রান্নাও সবসময় ভালো হয় না। বৈচিত্র্যও থাকে কম। তবে এই মুহুর্তে বাইরে কোথাও খেতে যাওয়ার কথা ভাবাও যাচ্ছে না। এখানে পৌঁছেই চট্টগ্রাম থেকে ভাড়া করে আনা গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে দূরে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। তাছাড়া এনার্জিও নেই। গতকাল রাতে ঘুমানো হয়নি। খেয়ে গিয়ে একটা ঘুম দিতে হবে। সন্ধ্যায় মিটিং আছে। কি খাবো? মেনুর শেষ পাতায় দেখি স্থানীয় খাবারের তালিকা। প্যাদা টিং টিংয়ের কথা মনে হলো। বাঁশের মধ্যে মুরগি। এটা খাওয়া যেতে পারে। ওয়েটার বলল, স্থানীয় কোন খাবারই এখন দেওয়া যাবে না। রাধুনি নেই। তাহলে কি দেওয়া যাবে জিজ্ঞাসা করতে বলল, অন্য সব দেওয়া যাবে। শেষ পর্যন্ত স্যুপ, ফ্রাইড রাইস আর ভেজিটেবল দিয়ে সারতে হলো খাওয়া। তারপর রুমে গিয়ে ঘুম। ড. ভ্যালেরিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম বিকেলে কোথাও যাবে কিনা? বলল, একবার হাঁটতে যাবে আশেপাশে। আমি বলে দিলাম আমাকে ডাকতে। পাঁচটার সময় তার ডাকেই ঘুম ভাঙ্গলো। ঝুলন্ত ব্রিজ পার হয়ে ওপারে গিয়ে ঘুরে ফিরে কেটে গেলো সময়টা। লেকের পানি এবছর অস্বাভাবিকভাবে কম। এতোটা কম আগে কখনো দেখিনি। ব্রিজের ওপারে গিয়ে দেখি টিলার উপর একটি চায়ের দোকান। কফিও পাওয়া যায়। কফিটা সত্যিই ভালো ছিল। কিছু ছবিও তুললাম। ফিরতি পথ ধরে ফিরে এলাম। পাহাড়ে অনেক স্থাপনা হয়েছে। দূরে আগেরবার যে পাহাড়টা খালি ছিল সেখানে এবার দেখলাম বর্ডার গার্ডদের রেস্ট হাউজ বানানো হয়েছে। পর্যটনের ঢোকার মুখেও দেখলাম সম্প্রসারণ ভবন তৈরি হচ্ছে।

ছয়.

ব্রিজ থেকে ফেরার পথে সেভ দি চিলড্রেনের তানভীর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। জানলাম যে তারা কিছুক্ষণ আগে এসে পৌঁছেছেন। রিসিপশনে এসে দেখি কারিতাসের তিনজনও এসে পৌঁছে গেছেন। ঢাকা আহসানিয়া মিশনের হামিম ভাইয়ের সঙ্গেও দেখা হলো। যারা মাত্র এলেন তাদের ফ্রেশ হওয়া দরকার। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে মিটিং এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হলো। মিটিংয়ে জানা গেলো আগামী দুই দিন আমরা কোথায় কোথায় যাবো। কিভাবে যাবো। সবশেষে জানানো হলো, কালকে ঠিক সকাল ৮ টায় ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে আমরা রওয়ানা হবো। কিন্তু পুলিশ আসতে দেরি করায় আমরা সকাল ৮টায় রওয়ানা হতে পারিনি। পুলিশ কেন সেটা বলছি।

২ এপ্রিল ২০১২

সাত.

নাস্তা সেরে আমরা সবাই যখন রেডি, জানা গেলো পুলিশ রেডি নয়। পুলিশ লাইন থেকে আমাদের সহকর্মী ফোনে জানালেন যে পুলিশ যারা আমাদের সঙ্গে যাবেন তারা মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন। নাস্তা সেরে আসতে কিছুটা দেরী হবে। অগত্যা কি আর করা। আবারো চা আর কফির অর্ডার হলো। ড. ভ্যালেরি জানতে চাইল দেরি হওয়ার কারণ কী? আমি বললাম, ‘তোমার জন্য।’ তার চোখেমুখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। তাকে ব্যাখ্যা করলাম। বিদেশীদের নিরাপত্তার জন্য পাহাড়ী অঞ্চলে চলাফেরাকালে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। তার নিরাপত্তার জন্য তিনজন পুলিশ সদস্য আসবেন। তারা এলেই আমরা রওয়ানা হবো। পুলিশের সংখ্যাটা তার বিশ্বাস হলো না। একজনের নিরাপত্তায় তিনজন পুলিশ। সে বলল, এটা নিশ্চয়ই সকলের জন্য। ভ্যালেরি এবারই প্রথম পাহাড়ে এসেছে। আমি মুচকি হেসে বললাম, এটা শুধু তোমার জন্য। তুমি হলে গিয়ে ভিআইপি। পরে অবশ্য জেনেছিলাম ১ থেকে ৫ জন পর্যন্ত বিদেশীর নিরাপত্তার জন্য তিনজন পুলিশ সদস্য থাকে। সংখ্যাটা ৫ এর বেশি হলে পুলিশ সদস্যের সংখ্যা বাড়ে।

আট.

পুলিশের তিন সদস্য এলো। একজনের হাতে রাইফেল। অন্য দু’জনের হাতে শর্টগান। আমরা দেরি না করে দলবেধে নৌকায় উঠতে রওয়ানা হলাম। আমাদেরকে যেতে হবে দোহাইয়া পাড়া। এটা হলো ২ নং মগবান ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড। আমাদের স্কুলটি ওখানেই। পরিকল্পনায় ছিল স্কুল শুরুর আগেই আমরা ওখানে পৌঁছাব কিন্তু পুলিশদের দেরির কারণে এখন আর সেটা সম্ভব হবে না। আমরা যে স্কুলে যাচ্ছি তার কাছেই জিপতলী ইউনিয়নে একটি সেনানিবাস আছে।

নয়.

স্কুলে গিয়ে দেখা হলো মগবান ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার ৫১ বছর বয়সী বিশ্বজিত্‌ চাকমার সঙ্গে। তিনি যখন প্রথমবার মেম্বার হন তখন তিনি জিপতলীর বাসিন্দা। সেখানে সেনানিবাস হওয়ার কারণে তাদেরকে নতুন করে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দোহাইয়া পাড়ায়। তার জন্ম জিপতলীতে। ছোটবেলায় এলাকার বিদ্যালয়ে পড়তে যেতেন। ওই বিদ্যালয় চলতো স্থানীয়দের অর্থায়নে। বড়ুয়া সম্প্রদায়ের একজন স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। সেসময়ে বিদ্যালয়গুলোতে প্লেন ডিস্ট্রিক্ট থেকে আসা বড়ুয়া সম্প্রদায়ের মানুষজন পড়াতো। জানতে চাইলাম, তাহলে কি বড়ুয়া (যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী)রাই এখানকার শিক্ষা বিস্তারে কাজ করেছেন? বিশ্বজিৎ বাবু বললেন, সেটা আমি ঠিক জানি না।

আলাপকালে তিনি বলছিলেন, “বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল তারা এলাকা ছেড়ে চলে যেতে লাগল। অনেকে বিদেশে চলে গেলো। আমাদের মতো যাদের অবস্থা ভালো নয় তারা থেকে গেলাম। অনেক পরিস্থিতির মধ্যে আমাদেরকে পড়তে হয়েছে। চারবার তো বাড়িই পালটাতে হলো। একবার তো ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হলো।”

কারা পুড়ে দিয়েছে জিজ্ঞাসা করায় বললেন, “কারা পুড়ে দিয়েছে সেকথা সবাই জানলেও কেউ বলে না। আমিও বলব না। সেসব বলে আর কি হবে? বরং সবসময় বলি, ভালো আছি।”

তিনি আরো জানালেন, “১৯৭৭ সালে তার পরিবার মগবান মৌজায় গড়ে উঠা গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় পান। সেসময়ে সেখানে একটি স্কুল চালু হলেও পরবর্তীতে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। লেখাপড়া করার জন্য এলাকার ছেলেমেয়েরা এখনো এলাকা ছাড়ছে। তারা বিদ্যালয়ে পড়ার জন্য কাপ্তাই শহরে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে যাচ্ছে। কিংবা হোস্টেলে থাকে চিটাগাং শহরে। যারা এলাকায় থাকে তারা উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে। এই অবস্থায় আমাদের স্কুলটি এখানে হওয়ায় খুব সুবিধা হয়েছে বলে তিনি বললেন। ‘স্কুলে যেতে পারার কারণে ওরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর।’- শিশুদের লেখাপড়ার গুরুত্ব এভাবেই তুলে ধরলেন ২ নং মগবান ইউনিয়নের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বিশ্বজিৎ চাকমা।

কাছাকাছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় এখানকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে পড়া অনিশ্চিত ছিল। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে শিশুদের জন্য লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে ঢাকা আহছানিয়া মিশন। শেয়ার কর্মসূচির অধীনে এখানে একটি সিএলসি বা শিশু শিক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা করে ঢাকা আহছানিয়া মিশন। ফলে এলাকার ২০টি দরিদ্র শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। সেসঙ্গে চাকরি মিলেছে স্থানীয় চাকমা তরুণী মনিকা চাকমার। আলাপকালে মনিকা জানালেন, ‘এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে পারায় আমি আনন্দিত ও গর্বিত।’ সেই ১৯৯৬ সাল থেকে পাহাড়ী জনপদে ঘুরতে ঘুরতে মনিকার মতো আরো অনেকের মুখে আমি একই কথা শুনেছি। অনেক আগেই পাহাড়ের মানুষ বুঝতে পেরেছিল লেখাপড়া ছাড়া তাদের মুক্তি নেই। তাই পরিবারের আকার সীমিত রাখার পাশাপাশি তারা পরিবারের সদস্যদের লেখাপড়ার উপর জোর দিয়ে আসছে। আগে যেখানে পরিবার প্রতি শিশুর সংখ্যা ছিল ৭/৮ জন এখন সেটি ৪/৫ জনে নেমে এসেছে। মনিকা দোহাইয়া পাড়ার এসএসসি পাস করা প্রথম ব্যক্তি। এবছর এইচএসসি দিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, তার এই বিদ্যালয়ের চাকরি শুধু এলাকার জন্য কাজের সুযোগই তৈরি করে দেয়নি, সেসঙ্গে তার নিজের লেখাপড়া অব্যাহত রাখার সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে।

কৃষি আর মৎস্যচাষ কাপ্তাই লেক পাড়ের মগবান ইউনিয়নের মানুষের আয়ের মূল উৎস। মাছ ধরার জন্য যে জাল তার দাম এতোটাই চড়া যে ৫/৬ পরিবারের সম্মিলিত চেষ্টায় সেটা কেনা সম্ভব হয়। দাদন ব্যবসার চল এখানে খুবই বেশি। বিশেষ করে মৎস্যজীবিদের মধ্যে তাদের সরব উপস্থিতি রয়েছে। ফলে লাভের গুড় পিপড়ায় খায়।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে তারা পাহাড়ে আরো বেশি লেখাপড়ার সুযোগ তৈরির উপর জোর দিয়েছেন। তারা মনে করেন লেখাপড়ার পাশাপাশি তারা যদি সরকারি চাকরিতে যেতে পারেন তবে তাদের অবস্থার উন্নতি হবে। কিন্তু সেসঙ্গে তারা একথাও বললেন, সরকারি চাকরি পাওয়া সহজ নয়। সাবেক ইউপি সদস্য স্বপন দত্ত চাকমা মনে করেন পকেটে ৫/৬ লাখ টাকা না থাকলে সরকারি চাকরি পাওয়া সম্ভব নয়।

কথা হলো বিশ্বজিৎ বাবুর মা রঙ্গমালা চাকমার সঙ্গে। তার বাড়িতে গেলাম। ওখানে একটি নতুন জিনিস দেখলাম। মুরগি মই দিয়ে উঠে খাচায় ডিমে তা দিচ্ছে। তার বাড়ির গাছের ডাবের পানির মতো সুস্বাদু ডাব শেষ কবে কোথায় খেয়েছি মনে করতে পারলাম না। তবে ওই ডাবের পানি আমার কাছে সেন্টমার্টিনের ডাবের পানির চেয়েও সুস্বাদু লেগেছে। রঙ্গমালা চাকমার সঙ্গে তার ঘর সংসার আর তার দিন কিভাবে কাটে সেসব নিয়ে গল্প হলো। চলে আসার আগে আতিথেয়তার জন্য আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে তিনি মায়ের হাসি দিয়ে বিদায় জানালেন। মনে মনে বললাম, “ভালো থাকুন মা, বাংলাদেশে!”

ঢাকা।।
৭ জুন ২০১৭

(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে। ৬ কিস্তিতে প্রকাশিত সেই লেখাটি কিছুটা সংশোধন করে এবার একসাথে প্রকাশ করা হলো। আগের লেখাটি অসমাপ্ত ছিল। এই লেখাটিও অসমাপ্ত থেকে গেলো।)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s