অসভ্য ছেলেগুলো ও তাদের পরিবার


stock-photo-the-man-with-the-gold-tooth-is-deceiving-people-a-liar-and-a-deceiver-472297843.jpgপ্রথম দিন ফোনে কথা বলেই মেয়েটি প্রেমে পড়েছিল। বাসায় জানিয়ে দিয়েছিল- বিয়ে নিয়ে আগাতে পারে। সবাই কমবেশি অবাক হয়েছিল। বেশি অবাক হয়েছিল মেয়েটির বড় বোন। নিজের মনের ভাব লুকাতে পারেনি। হয়তো চায়ওনি। সোজা জিজ্ঞেস করেছিল, “অন্তরা তুই সত্যিই বলছিস ওই ছেলেটিকে বিয়ে করবি?” অন্তরা নামের মেয়েটি অবাক গলায় বলেছিল- “হ্যা, আপু। কোন সমস্যা?” বড় বোন জয়তি এক মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “না সমস্যা নেই। জাস্ট অবাক হলাম। একদিন ফোনে কথা বলেই তুই মত দিয়ে ফেললি কি না তাই।”

অন্তরা বড়দের মতো ভাব নিয়ে বলল- “আপু যারা বোঝে, তারা একদিনেই বুঝতে পারে।”

জয়তি আর কথা বাড়াল না। তাছাড়া ছেলেটা মানে তপনের খোঁজ তো জয়তিই এনেছে। অন্তরা এতোদিন বিয়ে করবে না বলছিল। এখন তার আনা বিয়ের পাত্রকে অন্তরার ভালো লেগেছে জেনে তো খুশিই হওয়া উচিত্‌ তাই না। জয়তি অন্তরাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “হ্যারে আপু, তোর যখন পছন্দ হয়েছে আমরা তাহলে বাকি সব কিছুতে আগাই।”

অন্তরা এই কথা শুনে খুশি হলো। কিন্তু তার কিছু বলার আগেই ফোন বেজে উঠল। তপন রোম থেকে ফোন দিয়েছে। অন্তরা পাশের রুমে চলে গেলো কথা বলতে। জয়তি গেল মায়ের রুমে। ওদের বাবা নেই। জয়তিকেই সব সামলাতে হবে, মাকে সঙ্গে নিয়ে। তাই তারা অন্তরার বিয়ের বিষয় নিয়ে আলাপ করতে বসল। মাত্র দুই মাসে প্রস্তুতিতেই রোম প্রবাসী তপনের সঙ্গে অন্তরার বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়েতে যা যা করার সবই করা হলো। দুই পক্ষই অনেক হৈ চৈ করে বিয়ের অনুষ্ঠান করল। বিয়ের ৬ মাসের মধ্যে অন্তরা স্বামীর আবাসস্থলে চলে গেল। ওখানে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে অন্তরা বুঝতে পারল কতো বড় ভুলটা সে করেছে। তপন আগেও একটা বিয়ে করেছিল। সেই বিয়ের আইনত ডিভো‍র্স হয়নি। অন্তরা একা একা সব কিছু সামলাতে চেষ্টা করল। এভাবে ৩ বছর কেটে গেলো। শেষ পর্যন্ত অন্তরাকে হার মানতে হলো। সে তার বড় বোনের সাহায্য চাইল। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা হলো বাংলাদেশে থাকা তপনের পরিবারের সবাই জানত যে, তপন আগে বিয়ে করেছিল। কিন্তু তারা সেই কথা লুকিয়েছিল। আর অন্তরা যখন বিষয়টি জেনে গেলো তখন তপনের বোনেরা বলল, তোমার ভালো না লাগলে চলে যাও। আমাদের ভাইকে বিয়ে করার জন্য মেয়ের অভাব নেই। অন্তরা ভেবেছিল সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেটা হয়নি। এখন অন্তরাকেই চলে যেতে হবে। আর কিছুর জন্য না হোক, একজন মিথ্যাবাদীর সঙ্গে সে সংসার করতে পারবে না। অন্তরা এখন পুলিশের সহায়তা নিয়ে আলাদা বাসায় থাকছে। একজন আইনজীবিও নিয়োগ দিয়েছে। ও হ্যা, বলা হয়নি বুঝি। তপন শেষ দিকে অন্তরাকে যখন তখন বেদম পেটাতো। সেই পিটুনি অন্তরাকে শক্ত করেছে। অন্তরাকে সাহস জুগিয়েছে। অন্তরা পুলিশ ডেকে নিজের শেল্টার নিতে পেরেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি হবে, এখনই বলা যাচ্ছে না।

অন্তরাদের সংখ্যা বাংলাদেশে কম নয়। যেমন কম নয় তপনদের সংখ্যা। মৌসুমীর কথাই বলি। কতো আশা নিয়ে মৌসুমী বাংলাদেশের এক নামকরা পরিবারের ছেলেকে বিয়ে করেছিল। লন্ডন প্রবাসী সেই ছেলে ছিল উম্মাদ। তবে সবসময় তার রোগটি প্রকাশ পেত না। কিন্তু ছেলের পরিবার তথ্য গোপন করে মৌসুমীর সঙ্গে রক্স চৌধুরীর বিয়ে দিয়েছিল। বিয়ের কিছুদিন পরে মৌসুমী স্বামীর সংসারে লন্ডনে চলে যায়। লন্ডনে যাওয়ার তিন মাসের মাথায় একদিন রক্স ছুরি নিয়ে রাত দুইটায় যখন মৌসুমীকে ধাওয়া করল, আর মৌসুমী কোনমতে প্রাণ বাঁচাতে পারল সেই দিনই জানতে পারল তার স্বামী সিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত। মৌসুমীর শ্বশুর শাশুড়ি বোঝাতে চাইল, এটা এমন কিছু না। রক্স এমন একটা অবস্থান নিল যে, বিয়ে তো সে করেনি করিয়েছে তার মা-বাবা। মৌসুমী মন শক্ত করল এবং একসময় লন্ডন থেকে পালিয়ে চলে আসল।

অনেক বছর আগের কথা। তখনও মোবাইল ফোন কিংবা ইন্টারনেট চালু হয়নি। বুকিং দিয়ে ল্যান্ড ফোনে কথা বলতে হয়। ওই সময়ে আমেরিকা প্রবাসী সৈকতের পরিবারের পছন্দের মেয়ে রত্মা ফোনে কথা বলতে বলতে সৈকতের প্রেমে পড়ে গেল। তারপর একসময় তাদের বিয়েও হলো। সৈকত বাংলাদেশে ১৫ দিনের জন্য এসেছিল। তারপর যে ফিরে গেলো আর আগের মতো খোঁজ খবর নেয় না। এমনকি সৈকত তার পরিবারে থাকা মা-বাবা কিংবা ভাইবোনদের সঙ্গেও যোগাযোগ করে না। মধ্যবিত্ত পরিবারের রত্না পড়ল মহা ফ্যাসাদে। দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। সৈকতের কোন খোঁজ নেই। একসময় রত্না জানতে পারে সৈকত আমেরিকাতে এক সাদা চামড়ার সঙ্গে ঘর সংসার করে। বিষয়টি নিয়ে রত্নার পরিবার সৈকতের পরিবারের সঙ্গে আলোচনায় বসল। একপর্যায়ে সৈকতের পরিবার স্বীকার করল যে, তারা বিষয়টি জানত। তারা ভেবেছিল দেশী মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এরপর আসল ডিভোর্সের বিষয়টি। সৈকত তো ডিভোর্স দেবে না। সে অনেক ঝক্কি ঝামেলা করে অবশেষে মুক্তি মিলেছিল রত্নার।

মৌসুমী ও রত্না এখন ভালো আছে। তাদের দু’জনেরই সুখের সংসার। মৌসুমীর এক মেয়ে। অন্যদিকে রত্নার এক ছেলে। তারা দু’জনেই স্বামী সন্তান নিয়ে সুখের সংসার করছে। আমি ভাবছি অন্তরার কী হবে?

পল্লবী। ঢাকা।।
১৩ জুন, ২০১৭

Advertisements

2 thoughts on “অসভ্য ছেলেগুলো ও তাদের পরিবার

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s