বিয়ের আগের দিনগুলো-১


প্রাককথন: কমপিউটারের ফাইল ম্যানেজমেন্ট অনেক কঠিন কাজ। গত ২০ বছরে যতো ফাইল জমা হয়েছে সেগুলোর ব্যবস্থাপনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে ফাইল কপি করে এখানে ওখানে রাখার কারণে প্যাচ লেগে গেছে। গত কয়েকমাস ধরে সেই প্যাচ ছোটাচ্ছি। কিন্তু ছুটছেই না। এদিকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ফাইল তৈরি হচ্ছে। সবমিলিয়ে এক ধরনের লেজেগোবর অবস্থা। জগাখিচুড়ি এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য রমজান মাসের শুরু থেকে নতুন করে চেষ্টা শুরু করেছি। নিয়ম বেধে কাজ করছি। আর পুরনো ফাইল ঘাটতে গিয়ে হাজারো স্মৃতি সামনে চলে আসছে। ভাবছি যখন যেটা মনে পড়ে লিখে ফেলব। সেই ভাবনা থেকেই বিয়ের আগের দিনগুলো নিয়ে লেখার চিন্তাটা এলো। এটাতে নাম্বার দিচ্ছি, কারণ আজকে একটা লেখা লিখলাম তো আবার কয়েকদিন পরে আরেকটা লিখব। সেগুলোকে একটা সিরিজের মধ্যে রেখে দেওয়া আর কি। একবার ভেবেছিলাম সিরিজের নাম দেব প্রেমের দিনগুলো। কিন্তু তাতে সময়কালটা সীমিত হয়ে যাবে। একটু বিস্তৃত সময়কে ধরে রাখার জন্য নামটা বিয়ের আগের দিনগুলো দিলাম। পরে লেখাগুলোকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করার ইচ্ছে আছে।  সেখানে একটা পর্ব প্রেমের দিনগুলো করে দেব, ভাবছি।

কমপিউটার যখন ছিল না তখন হাতে লেখাটাই ছিল ভরসা। লিখতে আমার তখনও ক্লান্তি লাগতো না। এখনো না। তবে সেসময়ে এখনকার মতো দ্রুত লিখতে পারতাম না। কমপিউটার আমার লেখালেখি দ্রুততর করেছে। চিন্তায়ও গতি এনেছে। সেটা হয়তো অভিজ্ঞতার কারণেও কিছুটা বেড়েছে। সেসময়ে ই-মেইলও ছিল না। তাই চিঠিপত্র আদান প্রদানের একটি মাধ্যম ছিল ডাক বিভাগ। ডাক হরকরা চিঠি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিত। আমরা বলতাম পোস্টম্যান। কেউ কেউ বলত পোস্ট অফিসের পিয়ন। ডাকপিয়নও বলতো কেউ কেউ। সরকারি উর্দি পড়া সেই পোস্টম্যানের সঙ্গে বাড়ির ছোটবড় সবার এক ধরনের খাতির ছিল। সেই খাতিরের কারণও ছিল ভিন্ন ভিন্ন। সেটা ভিন্ন গল্প। অন্য সময়ে করা যাবে।

13415391_10153586411233456_506501096913505753_o

মৌচাকের চাংপাই চায়নিজ রেস্টুরেন্ট (রেস্টুরেন্টটা কি এখনো আছে?) থেকে বের হয়ে রিকশায় ফিরছি। ১৯৯১ সালের ছবি।

এ্যানীর সঙ্গে আমার প্রেমের শুরুটা ১৯৯০ সালের ৬ জুলাই। পরিচয়টা অবশ্য তারও কয়েকমাস আগে। আমাদের প্রেমের বড় একটা অংশ জুড়ে ছিল আড্ডাবাজি। আমরা দু’জনে ঢাকা শহরে একসঙ্গে রিকশায় প্রচুর ঘুরে বেড়িয়েছি। প্রচুর হেঁটেছি। আর প্রচুর সময় পার্কে আর রেস্টুরেন্টে কাটিয়েছি। আর একসঙ্গে হওয়া মানে প্রচুর কথা বলা। এখন ভাবতে গিয়ে অবাক লাগে, কী এমন কথা বলতাম দু’জনে! তবে সেসময়ে এ্যানী আমার লেখা নিয়ে কথা বলত।

প্রেমকালীন সময়টায় এ্যানী আমার লেখার পাঠক ছিল। এমনি এমনি পাঠক নয়, বোদ্ধা পাঠক। আমি তখন অনেক পত্রিকায় লিখতাম। এর মধ্যে সাপ্তাহিক বিক্রমে নিয়মিত আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে লিখতাম। মনে পড়ে বেনজির ভূট্টোকে নিয়ে আমার একটি লেখার খুটিনাটি নিয়ে সে আলাপ করেছিল। বিয়ের পর বুঝতে পেরেছি পারিবারিক কারণেই ইতিহাসের ব্যাপারে এ্যানীর এক ধরনের ঝোঁক ছিল। কারণ আমার শ্বশুর ছিলেন ইতিহাসের পোকা। আর আমার চাচা শ্বশুর তো রীতিমতো ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন রাজশাহী কলেজে। এ্যানী তার বাবার গল্পের বড় শ্রোতা ছিল। আমার মেয়ের মধ্যে ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ মূলত জেনেটিক্যাল। পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভূট্টো আর ভূট্টোর পরিবার নিয়ে এ্যানীর পূর্ব জ্ঞান, সেদিন তাকে আমার লেখার পাঠক সমালোচক করেছিল। তাছাড়া রহস্য পত্রিকায় প্রকাশিত আমার লেখাগুলো নিয়েও এ্যানী  প্রচুর আলাপ করত। প্রেমের সময় এ্যানী প্রায়ই বলত বিয়ের পর রাত জেগে আমার লেখালেখিতে সাহায্য করবে আর আমাকে চা বানিয়ে খাওয়াবে। মজার ব্যাপার হলো- বিয়ের পর এ্যানী আমার লেখা পড়াই শুধু ছেড়ে দেয়নি, আমাকে চা খাওয়ানোর কথাও ভুলে গেছে। আমি অবশ্য কয়েকদিন মনে করিয়ে দিয়েছি। তাতে খুব একটা কাজ হয়নি।

10996495_10152664963113456_2138556393055101903_o

বেঙ্গল ওয়াটার লঞ্চে চাঁদপুর যেতে যেতে এ্যানীকে চিঠি লিখছি। সঙ্গে ছিল শামীম। ছবিটা ওরই তোলা। সম্ভবত ১৯৯০ সালের ছবি।

একসঙ্গে এতোটা সময় কাটানোর পরও দেখা যেতো আমরা বাসায় ফিরে আবার ফোনেও কথা বলছি। এমনকি চিঠিও লিখছি। সেই সকল চিঠি সবই জমানো আছে। আজকের লেখাটা সেই চিঠি সংক্রান্তই। এ্যানীকে চিঠি লেখার এক অদ্ভুত নেশায় আমাকে পেয়ে বসেছিল। যখন যেখানে যাই সেখান থেকেই চিঠি লিখি। যেমন ধরুন সদরঘাট গিয়েছি সকাল সকাল কাউকে রিসিভ করার জন্য। শীতের সকাল। কুয়াশার কারণে লঞ্চ আসতে দেরি হচ্ছে। আমি সদরঘাট টার্মিনালে বসে আছি। কী করব? টার্মিনালের মেঝেতে পড়ে থাকা সিগারেট প্যাকেট থেকে ভেতরের পাতলা সোনালী কাগজটা বের করে চিঠি লিখতে বসে গেলাম।

১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনের পর আমি একটি জরিপের কাজে বাংলাদেশের ২০টি নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছিলাম। তার মধ্যে রাজবাড়ি জেলার পাংশাও ছিল। পাংশাতে ট্রেনে গিয়েছিলাম। এখন ঠিক মনে করতে পারছি না, স্টেশনের নামটা সম্ভবত গোয়ালন্দ ছিল। ওখানে সাড়ে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল ট্রেনের জন্য। কয়েকদিন ধরে এ্যানীর সঙ্গে দেখা নাই। কথা নাই। বেশি বেশি কথা বলা আর দেখা হওয়ার পর এই বিচ্ছেদ ভালো লাগছিল না। তখন তো আর মোবাইল ছিল না। যোগাযোগের জন্য ল্যান্ড ফোনও তেমন সহজলভ্য ছিল না। হঠাত্‌ করে দেখি স্টেশনের প্লাটফর্ম যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে একটি পোস্টঅফিস। আমি ধীর পায়ে হেটে সেখানে গেলাম। পোস্ট অফিস থেকে খাম কিনলাম। কাগজ কলম সঙ্গেই ছিল। এ্যানীকে চিঠি লিখলাম। তারপর সেটা ওদের বাসার ঠিকানায় পোস্ট করে দিলাম, সেই পোস্ট অফিস থেকেই। কিছুটা ভয় ছিল, চিঠিটা না অন্য কারো হাতে পড়ে। যাই হোক। সেটা হয়নি। চিঠিটা ঠিকঠাক মতোই এ্যানী পেয়েছিল। চিঠিটা ছিল ওর জন্য সারপ্রাইজ। আর আমার জন্য সেটা দিতে পারার ভালো লাগাটা ছিল অপরিসীম। আজকের লেখার চিন্তাটা সেই পোস্ট অফিস।

IMG_3794কমপিউটারের ফাইল ম্যানেজমেন্ট করতে গিয়ে একটা ছবি পেলাম। পোস্ট অফিসের। রাজশাহীর গোদাগাড়ির প্রধান পোস্ট অফিসের ছবি। ২০১৫ সালের ২ নভেম্বর আমি গিয়েছিলাম রাজশাহীর গোদাগাড়িতে। সেটাই আমার গোদাগাড়িতে প্রথম যাওয়া। তখন তপ্ত দুপুর। দুপুরের খাওয়ার পর হাতে কিছুটা সময় ছিল। নদীর ধারে গিয়েছিলাম, যেখানটায় থানা আছে। নাতিদীর্ঘ সরু একটা রাস্তা, এটাই নাকি উপজেলার প্রধান সড়ক। সেই সড়ক ধরে নদীর ধারে যেতে যেতে স্কুল, দোকানপাট আর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গোদাগাড়ি প্রধান ডাকঘরও রয়েছে। আমার মনে পড়ে গেলো সেই রাজবাড়ী পাংশা যাওয়ার পথে চিঠি লেখার কথা। আমি পোস্ট অফিসে ঢুকে গেলাম। ভেতরে খা খা করছে। একজনকে খুঁজে পেতে জানলাম, লাঞ্চ ব্রেক চলছে। আমি দেখলাম ঘড়ির কাটা ভিন্ন কথা বলছে। আমার অপেক্ষাতে আপত্তি নেই। কারণ আমাকে চিঠিটা তো লিখতে হবে। আমি কয়েক ছত্রের চিঠি লিখলাম। হয়তো খবর পেয়েই একজন এসেছেন। আমি তার কাছ থেকে কয়েকটা খাম কিনলাম। তারপর একটা খামে চিঠিটা ভরে ডাক বাক্সে না ফেলে তার হাতেই দিলাম, সিল মারার জন্য। ডাক যাবে কখন সেটাও জানলাম। কারণ আমি ঢাকায় ফিরে আসার আগেই যেন এ্যানী চিঠিটা পায়। গোয়ালন্দের সেই ট্রেন স্টেশন থেকে চিঠি পোস্ট করতে গিয়ে যে ভয় কাজ করছিল, সেটা আজকে মোটেই করেনি। তবে এই চিঠি অন্য কেউ পড়ুক সেটাও আমি চাই না। আমি জানি সেটা এখন হবার নয়। যাই হোক।

৪ তারিখে ঢাকায় ফিরলাম। ঢাকায় ফিরে আমি এ্যানীর কোন প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। ডাক বিভাগের লোকটা বলেছিল ৩ দিনের মধ্যে চিঠি পৌঁছে যাবে। আমি আরো এক সপ্তাহ অপেক্ষা করলাম। প্রতিদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরে কোন ডাক এসেছে কিনা খোঁজ নেই। একদিন এ্যানী জিজ্ঞাসা করল, ডাকে কি আসবে? প্রতিদিন খোঁজ নিচ্ছি কেন? আমি বললাম, সারপ্রাইজ। তারপর আরো এক সপ্তাহ গেলো। আমিই সারপ্রাইজড! আজো সেই ডাক আসেনি। মোবাইলে চিঠিটার একটা ছবি তুলে রাখলেও পারতাম।

পল্লবী। ১৭ জুন ২০১৭।।
ঢাকা।।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s