ইসলামী জঙ্গিবাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস


তারা ঘুরে ঘুরে দোষ খুঁজে বেড়ায় আজকের ইতিহাসের বর্বর গণহত্যার শিকার মুসলিমদের। আমাদের এই সুশীলেরা মোটেও অশিক্ষিত নয়, তারা জানে কোন সত্য বলা সুশীলিয় পাপ আর কোনটা তাদের মেডেল এনে দিবে। সমস্ত ইতিহাস, সমস্ত সত্য অস্বীকার করে পশ্চিমাদের গলায় সুর মিলিয়ে গান গায় তারা, রচনা করে কবিতা-সাহিত্য, আর আমাদের ইতিহাস অজ্ঞ মুর্খ প্রজন্ম চোখ বুজে এদের অনুসরন করে যাচ্ছে প্রগতির নামে।

 

ইসলামী জঙ্গিবাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখাটি খন্দকার তাবিন হাসানের। তাবিন আমার কলেজ সহপাঠী। কলেজে পড়াকালীন দেখা হলেও হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু কখনো কথা হয়নি। ৩১ বছর পর ২০১৭ সালে ব্যাচ ৮৬ এর সহপাঠীরা যখন একত্রিত হলো অন্য অনেকের মতো তাবিনের সঙ্গেও দেখা হলো। কথা হলো। তাবিন পেশাগতভাবে অধ্যাপনা করেন। তার পড়ানোর বিষয়বস্তু কমপিউটার সায়েন্স। নিজে পিএইচডিও করেছেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উপর। তার কাছের সহপাঠী বন্ধুরা বলে তাবিন একজন তুখোড় মেধাবী ও একজন মানবতাবাদী। স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে তাবিনের পরিবারের বিশেষ করে ওর বাবার অবদান রয়েছে। তাবিন একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ। ফেসবুকে মানুষের কল্যাণ নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন অবলীলায়। আমি তার লেখার একজন নিয়মিত পাঠক। সম্প্রতি তাবিন ৫ পর্বে একটি লেখা ফেসবুকে (https://www.facebook.com/search/top/?q=Tabin%20Hasan) পোস্ট করেছেন। প্রথম পর্বের ফুটনোটে তাবিন লিখেছেন যে, “আমি খুবি সংক্ষেপে লিখার চেষ্টা করছি, কারন বড় রচনা ফেইসবুকে কেউ পড়ে না। তবুও লিখছি, কারন আমাদের অন্ধ প্রজন্মকে জানতে হবে, শিখতে হবে, তারপর সত্য-মিথ্যা নিজেই বেছে নিবে। কারো কনফিউশন থাকলে কমেন্টে প্রশ্ন করুন। তথ্য ভুল হলে সংশোধন করে দিন…।” দ্বিতীয় পর্বের ফুটনোটে লিখেছেন যে, “বিষয় ভিত্তিক যোগসূত্র রক্ষার্থে আমি সময়ানুক্রমে কিছুটা আগ-পিছ করে ঘটনা লিখছি, বুঝতে অসুবিধা হলে জানাবেন। প্রসংগ যেহেতু “ইসলামী জঙ্গিবাদ”, তাই সমসাময়িক বিশ্বের অন্যান্য ঘটনাবলি না টানার চেষ্টা করছি…।” ৫ পর্বের লেখাটা পড়ার পর আমার মনে হয়েছে প্রায় ১০০ বছরের ইতিহাসকে সংক্ষেপে যেভাবে তাবিন মাত্র ৩ হাজার শব্দে তুলে ধরেছে সেটা অসাধারণ। যদিও তার এই লেখার সবকিছুর সাথে আমি একমত নই। কিন্তু ইতিহাস পাঠে আগ্রহীদের কাছে লেখাটা পৌঁছে দিতেই আমি আমার ব্লগে লেখাটা শেয়ার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করি আপনারা লেখাটা পড়বেন। এবং আপনাদের মতামত জানাবেন।

১৯৯৭, কোন এক ছুটির দিনের বিকেলে কয়েক বন্ধু মিলে ঘুরতে গেলাম নির্জন এক জায়গায়। জায়গাটি বারিধারার এমেরিকান এম্বাসী, ঠিক মূল ফটকের সামনে বসে রাত অবধি আড্ডা দিলাম। ভিতরে কয়েকজন গার্ড আর আমরা ছাড়া কোন জন মানুষের চিহ্ন নেই…

১৯১৬, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে, থমাস এডোয়ার্ড লরেন্সেকে ব্রিটিশ রাজ গুপ্তচরের কাজে পাঠিয়ে দিল আরবে। অক্ষ শক্তি অটোম্যান সাম্রাজ্য এবং জার্মান। লরেন্সের কাজ ছিল আরব বেদুইনদের সংগঠিত করে অটোম্যানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উস্কে দেয়া। ১৯১৮ তে সাম্রাজ্য ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে দাড়ায় বর্তমানের মধ্য প্রাচ্যের আংশিক রূপ। থোমাস এডোয়ার্ড লরেন্স পশ্চিমা প্রপাগান্ডায় আজ আরবের বন্ধু বিখ্যাত “লরেন্স অব এরাবিয়া”! প্যালেস্টাইন তখনো ব্রিটিশ অধীনে একটি রাজ্য যার ১১% ছিল ইহুদী, ৯.৫% ছিল আরব খৃস্টান। তখন পৃথিবী শান্ত…

১৯১৯ থেকে প্যালেস্টাইনে ইওরোপ থেকে ব্যপক ইহুদি মাইগ্রেশন শুরু হলে ১৯৩৩ সালে হয় আরব বিদ্রোহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৬ এ ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হলে তাদের প্রশাসনিক প্রধান কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা করে জায়নবাদী ইহুদীরা। বিংশ শতাব্দির এটাই ছিল প্রথম এবং সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা যাতে ৯১ জন প্রান হারায়। ১৯৪৮ সালে ডেভিড বেন গুরিয়ান স্বাধীন ইজরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। পশ্চিমা, বিশেষ করে আমেরিকার সমর্থনে ১৯৪৯ সালে রাষ্ট্রটি জাতিসংঘের সদস্যপদ পায়। অশান্তির সেই শুরু আজো শেষ হয়নি, ঢিলের বদলায় ইজরায়েলের বুলেট ছোড়ার নীতি তখন থেকেই…

Tabin_1_1
ফাদি আবু সালাহ, ২০০৮ এ যে দুই পা হারিয়েছিল ইজরায়েলি বিমান হামলায়, ২০১৮ তে সেই প্রতিবাদী যোদ্ধা ঢিল ছোড়ার অপরাধে নিহত হন ইজরায়েলি সেনার গুলিতে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই সাড়া বিশ্বে নাড়া পরে সাম্যবাদী বিপ্লবের – শোষিত, বঞ্চিতের মুক্তির আশায়। দেশে দেশে বিপ্লব, এমনকি এই ভারত মুলুকেও। ভীত হয়ে পরে পুঁজিবাদি সাম্রাজ্যবাদ…

১৯৩৩ সালে সৌদি- আমেরিকার প্রথম তেল চুক্তি হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরেই সোভিয়েত কমিউনিজম ঠেকাতে তাদের সাথে গোপন আরেকটি চুক্তি হয় যাতে মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া হয় ওয়াহাবিজম এর সন্ত্রাসী মৌলবাদ…

১৯৭৯, আফগানিস্তানে হাফিজুল্লাহ আমিনকে ক্যু এর মাধ্যমে হটিয়ে ক্ষমতায় আসে বামপন্থি বারবাক কারমাল এবং সেই সাথে আসে সোভিয়েত ৪০ তম সেনাবাহিনী। এই সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যারা জেগে উঠে, তারা সেই “আল মুজাহেদ্বীন”, আমেরিকার সামরিক, পাকিস্তানের ভূমী এবং সৌদির অর্থ সহায়তায় তারা সংগঠিত হয়েছিল। তখন তারা বীর, পৃথিবীর সন্মানিত মুক্তিযোদ্ধা। ওসামা বিন লাদেন সেই যুদ্ধেরই ফসল। ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত বাহিনী পিছু হটে। তার এক বছরের মাথায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে…

১৯৭৩ সালে আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে প্রায় পরাজিত ইজরায়েলকে উদ্ধারে ছুটে আসে মার্কিনিরা। প্রতিবাদে সৌদি বাদশা ফয়সাল বিশ্বে জ্বালানী তেল রপ্তানি বন্ধ করে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৩ ডলার থেকে বেড়ে দাড়ায় ১২ ডলারে। এটাই ছিল পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে আরবদের প্রথম অবরোধ, যার স্বাদ পশ্চিমারা আর কখনোই হজম করতে চায় নি। ১৯৭৫ সালে তথাকথিত প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে খুন হয় বাদশা ফয়সাল…

১৯৭০, সৌদি আরব গরীব মুসলিম দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে অর্থ সাহায্য শুরু করে; উদ্দেশ্য ওয়াহাবি মতবাদ প্রচার। শুরুতে তাদের বিনিয়োগ ছিল মাদ্রাসা ও মসজিদগুলোতে। গরীব দেশগুলো এটাকে ধর্মীয় চ্যারিটি হিসেবে দেখতে থাকে। তৎকালীন ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ছিল এই কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। তখনো আমরা বুঝতে পারিনি এই মাদ্রাসাগুলো আসলে ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাবিহীন উগ্রবাদী ওয়াহাবি মতাদর্শের ধর্মান্ধ সৃষ্টির কারখানা। শুরুতে এই প্রজেক্টের লক্ষ্য ছিল সমাজতন্ত্র ঠেকানো যেটা আমি আগেই কিছুটা উল্লেখ করেছি…

১৯২২, মধ্যপ্রাচ্যে তেল আবিস্কারের পর থেকে গোটা বিশ্বের নজর আরবে। আরব বিভক্তির শুরুটা ছিল অটোম্যান সাম্রাজ্যকে ভেঙ্গে দেয়া। বিভাজিত রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল করে তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে দ্বিতীয় বিভাজন শুরু হয় । দেশে দেশে বসিয়ে দেয়া হয় মার্কিন পুতুল রাজতন্ত্রের। আবার এদেরকে জুজুর ভয় দেখানোর জন্য দিনে দিনে শক্তিশালী করা হয় ইজরায়েলকে…

১৯৫১, ইরানের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক ব্রিটিশ তেল কোম্পানীগুলোকে হঠিয়ে তেল সম্পদকে জাতীয়করন করেন, ইতিহাসে যা “আবাদান ক্রাইসিস” নামে পরিচিত। ১৯৫৩ সালে সিআইএ এবং ব্রিটিশ এমআই-৬ এর “অপারেশন এজাক্স” এর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় মোসাদ্দেককে, ক্ষমতায় বসানো হয় ব্রিটিশ পুতুল শাহ (কিং অব কিং) রেজা পাহলভিকে। ১৯৭৯ সালে নির্বাসিত খোমেনির নেতৃত্বে বিপ্লবে পতন ঘটে শাহের, পশ্চিমাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায় ইরানের দুয়ার। যা আজো খোলেনি…

১৯৭৯, ইরাকে আরব ন্যাশনালিস্ট ডি’ফ্যাক্টো লীডার সাদ্দাম হুসেইন ক্ষমতায় আসে। ১৯৮০ সালে তিনি আরব (বিশেষ করে সৌদি) এবং পশ্চিমা ব্লকের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আক্রমণ করেন ইরান (হয়ত তেলের দরজা খোলার আশায়)। আট বছরের এই যুদ্ধে প্রাণ হারায় প্রায় ৫ লাখ সেনা এবং ৫ লাখ বেসামরিক নাগরিক (এই দশ লক্ষ সংখ্যাটি মনে রাখবেন)। রাসায়নিক অস্ত্রের বহুবিধ ব্যবহারের যে কারিশমা তিনি দেখান তা ইতিহাসে বিরল হলেও সাড়া বিশ্ব তখন নীরব, আমেরিকার আইরনম্যান সাদ্দাম। সমস্যা বাধে যুদ্ধের শেষে, বিশাল ঋনের চাপ, এক কুয়েতেরই পাওনা ৩০ বিলিয়ন ডলার। এই ঋন মওকুফে কুয়েতকে চাপ দিলে কুয়েত ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সস্তা জনপ্রিয়তার আশায় সাদ্দাম ইজরায়েলে রাসায়নিক অস্ত্র হামলার হুমকি দেয় ১৯৯০ সালে, যেটা ছিল অনেকটা সাপের মুখে বিষ ছুড়ে মারার ভয় দেখানোর মত! অন্য দিকে কুয়েতের সাথে সম্পর্ক টানাপোড়েনে সাদ্দাম কুয়েত আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয় যেখানে প্রেসিডেন্ট প্রথম বুশ তাকে আমেরিকার এ বিষয়ে “নিরপেক্ষ” থাকার আশ্বাস দেয়। ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট সাদ্দাম কুয়েত আক্রমণ করে এবং সেই মাসেরই ২৮ তারিখে কুয়েতকে ইরাকের ১৯তম প্রোভিন্স হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়…

১৯৬৯, প্রো-ইজরায়েলি ইদ্রিসকে ক্ষমতাচ্যুত করে লিবিয়ার ক্ষমতা দখল করে আরব জাতিয়তাবাদী কর্নেল মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি। আড়াই বছরে নিজের ক্ষমতা সংহত করে ১৯৭২ সাল থেকে তিনি শুরু করেন রাষ্ট্রকে “ইসলামী সমাজতান্ত্রিক” এর নতুন ধারনায় দেশ সাজাতে। রাষ্ট্রের তেল সম্পদ জাতীয়করনের মধ্য দিয়ে ব্যাপকভিত্তিতে তিনি শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান উন্নয়নের কাজ শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে তার সমাজতান্ত্রিক মতবাদ প্রকাশিত হয় “The Green Book” নামের গ্রন্থে। ১৯৭৭ সালে “জামহারিয়া” (সংখ্যা গরিষ্ঠের দেশ) নামে রাষ্ট্রকে ইসলামী সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল আরেক জনপ্রিয় আরব জাতিয়তাবাদী মিশরের জামাল আদবেল নাসের। পশ্চিমাদের লিবিয়ার সাথে সম্পর্ক হয়ে উঠে ক্ষীণ এবং ইজরায়েলকে প্রকাশ্য শত্রু ঘোষণা করে গাদ্দাফী নিজের ডেথ ওয়ারেন্টে নিজেই সই করেন…

১৯৯১, সাদ্দামের কুয়েত দখলের শাস্তি দিতে আমেরিকার নেতৃত্বে এক হয় প্রায় গোটা বিশ্ব, শুরু হয় অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম। মাত্র কিছুদিন আগের “বাপের ব্যাটা” সাদ্দাম তখন বিশ্ব খলনায়ক। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট এরশাদও সেদিন ৫ হাজার সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। ৪১ দিনের যুদ্ধে পরাজিত হয় সাদ্দামের রিপাবলিকান গার্ড। যুদ্ধে সামরিক বেসামরিক মিলে ইরাকী নিহত হয় প্রায় ৪০ হাজার, আমেরিকার কোয়ালিশনে নিহত ১৪৭! অবরোধে অবরোধে জর্জরিত করে দেয়া হয় ইরাকের অর্থনীতি। মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে “তেলের বিনিময়ে খাদ্য” কর্মসুচি নেয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থায় যাতে জন প্রতি বরাদ্দ পায় ৩৯ সেন্ট যা দিয়ে মেটানো হবে খাদ্য, চিকিৎসা এবং শিক্ষা! যুদ্ধের প্রাক্কালে হাজার হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার দেশে ফিরে আসে শূন্য হাতে। সিআইএ’র তৈরী করা সৌদি ধনকুবের আফগান যুদ্ধের বীর ওসামা বিন লাদেন আর তার সুপ্রশিক্ষিত আফগান মুজাহেদ্বীনদের শুরু হয় স্বপ্ন ভঙ্গের পালা।

১৯৯২, রাশিয়াপন্থী নজিবুল্লাহ’র পতন ঘটে আফগানিস্তানে। গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের নেতৃত্বে গঠিত হয় কোয়ালিশন সরকার, কিন্তু শত নৃগোষ্ঠীর দেশে তারা আর কখনোই এক হতে পারেনি। টানা চার বছরের গৃহ যুদ্ধ শেষ হয় মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তালেবান সরকার ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালে। এই তালেবানরাই সেই সৌদি সাহায্যপুষ্ট মাদ্রাসা ছাত্র যাদের মূল উৎপত্তি ছিল পাকিস্তান। বহু বাংলাদেশীও তাদের সাথে সামিল ছিল, আজো আছে…

১৯৯৩ ফেব্রুয়ারী, কুয়েতি বংশোদ্ভূত রামজি ইউসুফের পরিকল্পনায় এবং পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত শেইখ খালিদ মোহাম্মাদের অর্থায়নে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নর্থ টাওয়ারে এক শক্তিশালী গাড়ি বোমার বিস্ফোরণে আলোচনায় চলে আসে অসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা, বোপন হয় ইসলামী সন্ত্রাসের প্রথম বীজ। নিহত হয় ছয় জন। পশ্চিমাদের আফগান হিরোরা এখন বিশ্ব সন্ত্রাসী।

১৯৯৮ অগাস্ট, আল কায়েদার পরিকল্পনায় সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয় নাইরোবি ও দারুস সালামের দুই আমেরিকান অ্যামবাসিতে, নিহত মোট ২২৪। প্রতিশোধে অগাস্টের ২০ তারিখে মনিকা লিউনিস্কি’র সাথে যৌন কেলেংকারিতে ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি বিল ক্লিনটন ক্ষেপনাস্ত্র হামলার নির্দেশ দেন ইরাক এবং সুদানে! তার এই হাস্যকর সিদ্ধান্ত নিজ দেশেই ব্যাপক সমালোচিত হয়। WTC এবং আমেরিকান অ্যামবাসিতে, দুই হামলা্রই দায় স্বীকার করে আল-কায়েদা। দাবী ছিল ইজরায়েলে মার্কিন সাহায্য বন্ধ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানো। তখনো এসব ছিল যৌক্তিক দাবী আদায়ের অযৌক্তিক পন্থা…

২০০১, ১১ই সেপ্টেম্বর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হয়ে যায় ইতিহাসের ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলা। ১৯ জন মুসলিম সন্ত্রাসী চারটি জেট বিমান হাইজ্যাক করে হামলা চালায় যথাক্রমে পেন্টাগন ও ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুই আইকনিক টাওয়ারে। চতুর্থ বিমানটিকে লক্ষ্যে আঘাত হানার আগেই ভূপাতিত করা হয়, যার দায় আল-কায়েদা কখনোই স্বীকার করেনি। নিহত প্রায় তিন সহস্রাধিক, বিধ্বস্ত হয় তিনটি বিল্ডিং, তৃতীয়টি বিধ্বস্ত হওয়ার কোন সঠিক কারন কেউ জানে না। ১৯ হাইজ্যাকারের ১৫ জন সৌদি নাগরিক, ২ জন আরব আমিরাত, ১ জন মিশরীয় এবং ১ জন লেবানিজ এবং দাবী করা হয় প্রকিল্পনাকারী আফগান গুহাবাসী ওসামা বিন লাদেন। পুরো বিশ্বের বিবেক নাড়া দেয় এই ঘটনায়, যা ইরাক-ইরান যুদ্ধে দশ লাখ মৃত্যুতে দেয়নি। এ ঘটনায় সংশ্লিস্ট করা হয় সাদ্দাম হুসেইনকে, লাদেনকে আশ্রয় দেয়ায় অভিযুক্ত করা হয় আফগান তালেবান সরকারকে, তবে ১৯ হাইজ্যাকারের ১৫ জনই কিন্তু সৌদি নাগরিক! ইজরায়েলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু হাজির হন ইরাকের WMD (Weapons of Mass Destruction) তত্ত্ব নিয়ে। ইজরায়েলের সরবরাহ করা ফ্যাব্রিকেটেড তত্ত্ব উপস্থাপন করে জাতিসংঘের ম্যানডেট নিতে সক্ষম হোন অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মের প্রাক্তন জেনারেল, সেক্রেটারি অফ স্টেট কলিন পাওয়েল, হামলা হবে ইরাকে। সারা বিশ্বের প্রতিবাদের মুখেই ২০০৩ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ইঙ্গো-মার্কিন কোয়ালিশনের হামলায় পতন ঘটে দুর্বল সাদ্দাম সরকারের। রিপাবলিকান গার্ডকে ঘোষণা করা হয় বিলুপ্ত, সাদ্দামের দুই পুত্র উদে ও কুসে নিহত হয় সেনা হামলায়, সাদ্দাম হয় গ্রেপ্তার, নিষিদ্ধ হয় সাদ্দামের বাথ পার্টি। ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০০৬ সালে ঈদ-উল-আযহা’র সকালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় সাদ্দামের। পুরো ইরাক তন্ন তন্ন করেও খুঁজে পাওয়া যায়নি তথাকথিত Weapons of Mass Destruction এর। ততোদিনে পুরো মধ্যপ্র্যাচ্যে ছড়িয়ে পরে বিলুপ্ত রিপাবলিকান গার্ডের বেকার সেনা সদস্যরা আর তাদের সাথে যোগ হয় সেই আল-কায়েদা। “জামাত আল তৌহিদ ওয়াল জিহাদ”এর ব্যানারে ইরাকব্যাপী বিদ্রোহ শুরু করে সালাফি-ওয়াহাবিরা, এরাই পরবর্তি আইসিস’এর পূর্বসুরী। তিন মাসের যুদ্ধে প্রাণ হারায় আনুমানিক ৪০ হাজার সেনা আর ৭ হাজার বেসামরিক নাগরিক।

Tabin_1_2
যুক্তরাষ্ট্র আর মিত্রদের বিমাল হামলায় দুই পা, দুই হাত হারানো আলী আব্বাস।

২০১০ ডিসেম্বর, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ, মেইনস্ট্রিম মিডিয়াকে পাশ কাটিয়ে জনতা প্রথম জেগে উঠে গনতন্ত্রের দাবীতে তিউনিসিয়ায় , যার নামকরণ করা হয় “আরব বসন্ত”। রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় ২৩ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট জাইন আল-আবিদিন বিন আলীকে। সৌদি আতিথিয়তায় পলাতক সস্ত্রীক বিন আলীকে বিচারে দুর্নীতির দায়ে সাজা দেয়া হয় ৩৫ বছর সাথে প্রায় ৫৮ মিলিয়ন ডলার জরিমানা। সৌদি রাজতন্ত্র কখনো বিন আলী ও তার পরিবারকে সাজার মুখোমুখি হতে ফেরত পাঠায়নি! এই আরব বসন্তের ঢেউ ২০১২ সালের মধ্যে ছড়িয়ে যায় যথাক্রমে মিশর, লিবিয়া এবং ইয়েমেনসহ অনেক দেশে। ৩০ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতন ঘটে ২০১১ এ। পাহাড় সমান দুর্নীতির অভিযোগ এবং হত্যায় অভুযুক্ত হয়ে তার সাজা হয় যাবজ্জীবন। পরে ২০১৫ তে সেই সাজা কমিয়ে আনা হয় ৩ বছরে, সাথে ১৬ মিলিয়ন ডলার জরিমানা।

২০১১, আরব বসন্তে পতন ঘটে ইয়েমেনের আবু আব্দুল্লাহ সালেহ সরকারের, তবে বসন্ত আর কখনোই আসেনি ইয়েমেনে। আজো গৃহযুদ্ধের অনলে জ্বলছে দেশটি। এক সময়ের সৌদি মিত্র আব্দুল্লাহ সালেহের অনুসারী হুথি বিদ্রোহীরা এখন যুদ্ধ করছে সৌদি সমর্থিত মনসুর হাদির সেনা বাহিনীর সাথে। এই যুদ্ধে হুথিদের বিরুদ্ধে শুধু আল-কায়েদা এবং আইসিসকে লেলিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হইনি মার্কিন সমর্থিত সৌদি, তারা নিজেরাও নিয়মিত বিমান হামলায় সামিল! এক কোটির উপরে ইয়েমেনী বিদ্যুৎ, খাদ্য, পানি বিহীন হয়ে সৃষ্টি করেছে আধুনিক ইতিহাসের বর্বরতম মানবিক বিপর্যয়। হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগ সত্বেও বিশ্ব নির্বিকার। ৩০ লাখের অধিক বাস্তুচ্যুত, প্রায় দুই লাখ শরনার্থী বিভিন্ন দেশে আশ্রয়প্রার্থী, নিহত দশ হাজারের উপরে, আর এ যুদ্ধের সব দায় কিন্তু ইরানের!

২০১১ ফেব্রুয়ারী, জনপ্রিয় আরব বসন্ত ছড়িয়ে দেয়া হয় শান্তিপূর্ন লিবিয়ায়। লক্ষ্য, মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির পতন। সেনা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে নিহত হয় শতাধিক বিক্ষোভকারী। মাত্র কয়েকদিনে বিদ্রোহীরা দখল করে নেয় কয়েকটি শহর, সাহাজ্যকারী তাদের পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকতায় আল-কায়েদা! বিদ্রোহ দমন ব্যর্থ করতে জাতীসংঘ জারি করে নো ফ্লাই জোন। বিদ্রোহীদের সহায়তায় কাতার কয়েকশ সৈন্য পাঠায়। ফ্রান্স আর আরব আমিরাত সরবরাহ করে অস্ত্র-গোলাবারুদ প্রশিক্ষণ। হাতে গোনা বিদ্রোহী হয়ে যায় বিশাল ক্ষমতাধর National Transitional Council (NTC)। বোকা বেদুইনরা আশায় থাকে দেশ তাদের ভরে উঠবে সুখের অরন্যে! ৩০ এপ্রিল ন্যাটো বিমান হামলায় নিহত হয় গাদ্দাফির এক পুত্র সহ তিন নাতী। অগাস্টে গাদ্দাফির ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব NTC নাকচ করে দেয়। ত্রিপোলি পতনের পর গাদ্দাফি আশ্রয় নেয় সিরতে। অক্টোবরের ২০ তারিখে পলায়নরত গাদ্দাফির কনভয়ে ন্যাটো বিমান হামলা চালায়, নিহত হয় পঞ্চাশের অধিক। ড্রেইন পাইপ থেকে গাদ্দাফিকে টেনে বের করে নির্মমভাবে হত্যা করে জিহাদী বিদ্রোহীরা। তার এই হত্যা সরাসরি প্রত্যক্ষ করে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিনটন। হাস্যোজ্জল মুখে বেরিয়ে এসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন “We came, we saw, he died.” (https://www.youtube.com/watch?v=mlz3-OzcExI)। কি ছিল এতো ক্ষোভ গাদ্দাফির বিরুদ্ধে! তিনি প্রথম আফ্রিকান ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেন, পেট্রো-ডলারের পরিবর্তে চালু করতে চান ‘গোল্ড দিনার’ নামে আফ্রিকাতে একটি একক মুদ্রা চালু করতে চান। আসুন এক নজরে দেখি তার শাসনামলের নাগরিক সুবিধাগুলি –

১। প্রত্যেক লিবীয় নাগরিকের বাড়ি-ঘর থাকাকে একটি মৌলিক অধিকার বলে গণ্য করত গাদ্দাফি প্রশাসন।
২। শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা ছিল সম্পুর্ণ ফ্রি। এমনকি কোন লিবীয় নাগরিক যদি দেশে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা বা শিক্ষা না পেতেন, সেক্ষেত্রে তাকে বিদেশে যাওয়ার অর্থ সরবরাহ করত রাষ্ট্র।
৩। ফসল উৎপাদনের সুবিধার্থে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প ছিল লিবিয়াতে। এটাকে গাদ্দাফি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বলে বর্ণনা করতেন। এটা নিয়েও অভিযোগ তোলা হয় গাদ্দাফি গোপন সামরিক বাংকার নির্মাণ করছেন।
৪। কেউ যদি খামার ব্যবসা করতে চাইতেন, তাহলে তাকে সরকারের পক্ষ থেকে বাড়ি, খামার, গবাদিপশু ও বীজ সরবরাহ করা হত।
৫। কোন মহিলার ঘরে নবজাতক জন্ম নিলে মা ও বাচ্চার জন্য সরকার ৫ হাজার মার্কিন ডলার সরবরাহ করত।
৬। বিনামূল্যে বিদ্যুত সুবিধা দেয়া হত সকল লিবীয়কে।
৭। গাদ্দাফি শিক্ষার হার ৩৫ শতাংশ থেকে ৮৭ শতাংশে উন্নীত করেন; এর মধ্যে ২৫ শতাংশ লিবীয় নাগরিকের বিশ্ববিদ্যালয় সনদ ছিল।
৮। লিবিয়ার রাষ্ট্রায়াত্ত্ব একটি ব্যাংক থেকে শূন্য শতাংশ হারে ঋণ দেয়া হত এবং এর কোন বৈদিশিক ঋণ ছিলনা।
৯। গাদ্দাফির শাসনামলে দেশটিতে পেট্রোলের দাম ছিল প্রতি লিটার ০.১৪ ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় ১১ টাকা।

এছাড়া, তেল বিক্রি করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে অর্থ আসত তা প্রত্যেক লিবীয় নাগরিকের ব্যাংক হিসেবে আনুপাতিক হারে চলে যেত। প্রত্যেক লিবীয় দম্পতিকে বিয়ের পর ৫০ হাজার ডলার’সহ নতুন বাসা কিনে দিত সরকার!”

[লিবিয়ার নাগরিক সুবিধার অংশটুকু নেট থেকে কপি করা, প্রকৃত লেখকের কেউ নাম জানালে বাধিত হব। তথ্যে ভুল থাকলে সংশোধন করে দেয়ার অনুরোধ রইল…]

পশ্চিমাদের বাধানো এই গৃহযুদ্ধে নিহত হয় প্রায় ২৫ সহস্রাধিক। বাস্তুচ্যুত এবং রিফিউজি হয় লক্ষাধিক, যারা আজ ইওরোপের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে। আইসিস, আল-কায়েদার তীর্থভূমি লিবিয়া উঠে দাড়াতে পারেনি আজো…

২০১১ মার্চ, লিবিয়ার পদ্ধতিতেই বসন্ত জাগরণ হয় সিরিয়ায়। লিবিয়ার মত দ্রুত পতন ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে জুনে সৃষ্টি করা হয় সিরিয়ান লিবারেশন আর্মি। ২০১২ তে আত্নপ্রকাশ ঘটে আল-কায়েদার ছায়া সংগঠন আল নুসরা ফ্রন্টের। লক্ষ্য বাশার সরকারের পতন, ঠিক আরেকটি লিবিয়ার মত। অথচ আমরা জানি এই আল কায়েদাই ৯/১১ টুইন টাওয়ারে হামলার জন্য দায়ী (পশ্চিমাদেরই মতে)! সৌদি অর্থায়নে, ইজরায়েলি প্রশিক্ষণে এবং পশ্চিমা অস্ত্রে সজ্জিত আল কায়েদার আরেক শাখার আত্নপ্রকাশ ঘটে ১৯৯৯ এ, নাম তার আইসিস/আইসিল/দায়েশ। ২০১৪ এ তারা ইরাকী সেনা হটিয়ে মসুল পর্যন্ত দখল করে নেয়, পশ্চিমে চলে যায় যুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়ার গভীরে। তাদের বর্বরতার চিত্র সাড়া বিশ্বে প্রকাশ হয়ে পড়লে সৌদি-মার্কিন জোট তাদের সমর্থন অনেকটা গুটিয়ে নেয়, শক্তিশালী করা হয় তথাকথিত মডারেট বিদ্রোহী আল নুসরা ফ্রন্টকে। রাশিয়া-ইরানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই সব ভুঁইফোড় বিদ্রোহীরা কোনঠাসা হয়ে পড়লে সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করে ইজরায়েল। যুদ্ধ এখনো চলছে, এযাবত নিহত নারী-শিশু সহ ৬ লাখের উপরে।

Tabin_1_3
এটি হিরোশিমার রঙ্গিন চিত্র নয়, এটি সিরিয়ার কোবানি। হিরোশিমার মত এমন হাজার কোবানি ছড়িয়ে আছে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন জুড়ে।

মার্কিন কোয়ালিশন হামলায় মৃত্যুপথযাত্রী সিরিয়ার সেই শিশুর “আল্লাহ্‌কে সব বলে দিব” ছবিটি কি দেখেছেন? সিরিয়ার গৌতায় সেই ছোট্ট মেয়েটিকে, যে মৃত্যুর পরেও শিশু বোনটির অক্সিজেনে মাস্কটি ধরে রেখেছে? মনে পরে ২০০৩ সালে ইঙ্গো-মার্কিন জোটের বোমা হামলায় দুই হাত, দুই পা হারানো সেই আলী আব্বাসকে?

প্রথম ছবিটি মৃত্যুর আগে শিশুটি যখন বলছিল “আল্লাহ্‌কে সব বলে দিব। দ্বিতীয় ছবিতে সেই ছোট্ট মেয়েটি, মৃত্যুর পরেও শিশু বোনটির অক্সিজেন মাস্কটি ধরে রেখেছে।

The first casualty of war is truth.
-Hiram Johnson

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি যুদ্ধই শুরু হয় মিথ্যার বেসাতি দিয়ে! কেউ না কেউ কোন এক মিথ্যার ওজুহাতে বাজায় যুদ্ধের দামামা, জীবন দেয় নিরীহ নারী, পুরুষ, শিশু। আর এই যুগে তো হাজার মানুষের মৃত্যু কারো ইচ্ছায় মাত্র একটি বোতাম টিপলেই হয়ে যায়। ১৯৯১ থেকে আজ পর্যন্ত ২৭ বছরে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় এক কোটি পচিশ লাখ। আহত কত কোটি, বাস্তুচ্যুত কত কোটি তার সঠিক হিসাব কারো জানা নেই। ২০০৮ থেকে ২০১৭ এর মধ্যে শুধু ইওরোপেই অফিসিয়াল আশ্রয় প্রার্থীর সংখ্যা ৫৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯৯০। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এই হিসাবের বাইরে। এরা নিঃস্ব, এরা সর্বশান্ত… এরা মুসলিম, এরা সন্ত্রাসী, এরা বিশ্বের বোঝা! এদের কেউ কেউ পরিবারের বেঁচে থাকা একমাত্র সদস্য। এদের মধ্যেই আবার লুকিয়ে আছে মার্কিন-ইজরায়েলি এজেন্ট আল-কায়েদা।

আমরা একাত্তরের বর্বরতার বিচার আজো করছি, তাহলে যাদের পরিবার এমন বর্বরতার সাক্ষী তাদের মনের অবস্থা কি! ওয়াহাবি মগজ ধোলাইয়ে বড় হওয়া এদেশের দরিদ্র, আধুনিক শিক্ষা বঞ্চিত মাদ্রাসা ছাত্রদের প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে? তাদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে, তাদেরই সৃষ্টি আল-কায়েদা আইসিস, তাদেরই দেখানো পথে সন্ত্রাস ছড়িয়ে দেয় সুদুর ইন্দোনেশিয়া থেকে বাংলাদেশে, সাড়া পৃথিবীকে দেখিয়ে দেয় মুসলিম কত বড় সন্ত্রাসী, ইসলাম একটা সন্ত্রাসের ধর্ম…

১৯৬৮ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত উত্তর আয়ারল্যান্ডে IRA আর বৃটিশ সেনা সংঘর্ষে নিহত হয় প্রায় চার হাজার। ১৯৭২ এ নর্থ আয়ারল্যান্ডের ডেরি শহরে সিভিল রাইটস এসোসিয়েশনের এক শান্তিপূর্ন সমাবেসে গুলি চালায় বৃটিশ সেনারা, নিহত হয় তাৎক্ষনিক ১১ জন। এরই ধারাবাহিকতায় লন্ডনে সন্ত্রাসী বোমা হামলা হয় প্রায় শ’ খানেক। ক্যাথোলিক আয়ারল্যান্ড সমর্থিত উচ্চ শিক্ষিত সাদা চামড়ার ইয়োরোপিয়ানও তখন বৃটিশ নিপীড়নের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়, সুশীলেরা কেউ আজ সে কথা মনে রাখেনি। তারা ঘুরে ঘুরে দোষ খুঁজে বেড়ায় আজকের ইতিহাসের বর্বর গনহত্যার শিকার মুসলিমদের। আমাদের এই সুশীলেরা মোটেও অশিক্ষিত নয়, তারা জানে কোন সত্য বলা সুশীলিয় পাপ আর কোনটা তাদের মেডেল এনে দিবে। সমস্ত ইতিহাস, সমস্ত সত্য অস্বীকার করে পশ্চিমাদের গলায় সুর মিলিয়ে গান গায় তারা, রচনা করে কবিতা-সাহিত্য, আর আমাদের ইতিহাস অজ্ঞ মুর্খ প্রজন্ম চোখ বুজে এদের অনুসরন করে যাচ্ছে প্রগতির নামে। এসত্য এমনি নির্মম, এমনি ভয়ানক যে উচ্চারণ দূরে থাক আমার এই পোস্টে লাইক বাটন টিপতেও অনেকের বুক কাপে, এই বুঝি ক্যারিয়ারটা চলে যায়!

আপনারা কোথাও সৌদি রিফিউজি দেখেছেন? আমিরাতী কিংবা কুয়েতি? বরং পশ্চিমারাই যায় ওদের ওখানে কাজ করতে দ্বিগুণ আয়ের আশায়, যেমনি আমরা যাই ইওরোপ-আমেরিকায়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে আজ ব্ল্যাক-গোল্ড খ্যাত এই তেলের যুদ্ধের বলি না হলে তেল সমৃদ্ধ এসব দেশের কে যায় রিফিউজি হয়ে মাতৃভূমি ছেড়ে! আমরাও তো যাই না, বরং আশ্রয় দিয়েছি জাতি নিধনের শিকার দশ লাখ রোহিঙ্গা শরনার্থীকে। আপনারা সৌদি রাজতন্ত্র চোখে দেখেন না, কুয়েতি রাজতন্ত্র চোখে দেখেন না, আমিরাতি রাজতন্ত্র চোখে দেখেন না, চোখ পরে শুধু ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া, সিরিয়ায়! ওল্ড ম্যান ইজ ব্যাক, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আবার ঠিক একই কায়দায় উপস্থাপন করলো ইরানের পারমানবিক সক্ষমতার গল্প, তাকিয়ে আছি আরেক যুদ্ধের দিকে…

শুরু করেছিলাম আমার আমেরিকান অ্যামবাসির সামনে আড্ডা মারার গল্প দিয়ে। আজ সেই আমেরিকান অ্যামবাসির নিরাপত্তার দিকে তাকিয়ে দেখুন। বিশ্বাস হয় আমার সেই ৯৭ সালের গল্পটি! আইসিস আজ আঘাত হানে বাংলার বুকে, এক অপারেশনে হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে কেরে নেয় ২০টি তাজা প্রান। গুলশান-বারিধারায় গেলে মনে হয় এক যুদ্ধে আছি আমরা!

আইসিস, আল-কায়েদা, ইজরায়েল, পূর্ব-পশ্চিম সুশীল, প্রগতিশীল, মুক্তমনা, গনতন্ত্রের দিশারী, সভ্যতার বাতিঘর সব একই অক্টোপাসের ভিন্ন ভিন্ন বাহু। এরা শুধু সময় মত রং বদলায়। এরা মেডেল দেয়, মেডেল নেয়, লাল রক্তে রাঙ্গানো মেডেল।

মেডেল চাই, মেডেল? রক্তে রাঙ্গানো সুশীল মেডেল? এক চোখ বন্ধ করে দু’কলম লিখুন, ঠিক ঝুলে যাবে গলায়…

মনে পরে সেই আয়লান কুর্দির কথা? ২০১৫ তে আইসিস হামলা থেকে বাঁচতে তার পরিবার পালিয়ে আশ্রয় নেয় তুরস্কে। মাতৃভূমি নিরাপদ ভেবে তারা আবার ফিরে যায় সিরিয়ায়, পরে আইসিসের নতুন হামলায় তারা আশ্রয় প্রার্থনা করে কানাডা সরকারের কাছে, কানাডা আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তারা আবার ফিরে যায় জীবন বাঁচাতে তুরস্কে। সেপ্টেম্বর ২, ২০১৫, রাতের অন্ধকারে ছোট্ট ভেলায় তারা তুরস্কের বদ্রুম থেকে পাড়ি জমায় গ্রীসের কস দ্বীপের উদ্দেশ্যে। যাত্রার পাঁচ মিনিটের মধ্যে নৌকা উল্টে ভূমধ্য সাগরে ভেসে যায় গোটা পরিবার। পরদিন ভোরে নতুন দিনের নতুন সূর্যের আলোয় দুই গ্রামবাসী সৈকতে আবিষ্কার করে আয়লান কুর্দির লাল টুকটুকে জামা পরা ছোট্ট নিথর দেহ, যেন ভূমধ্য সাগরের গলায় পরা মেডেল। পরদিন ভাই গালিব আর মায়ের সাথে অজানা ভূমীতে সমাহিত হয় আয়লান…

Tabin_1_6

(শেষ)
খন্দকার তাবিন হাসান
অধ্যাপক
৩০ মে ২০১৮

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s