তার সাথে আমার ৩০ বছর পরে দেখা এবং…


আমি তার গল্প শুনি। তার ভালো লাগার গল্প। তার ভালো থাকার গল্প। তার সাফল্যের গল্প। তার স্বপ্নের গল্প। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে আমাকে সে দুয়েকটা প্রশ্ন করে। প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। বুঝতে পারি মিলিয়ে দেখতে চায়। বুঝে নিতে চায়। আমি টের পাই তার চোখ আমার মুখে কিছু একটা খুঁজে বেড়ায়। স্বভাবগত কারণে আমি চাইলেও তাকে সবসময় খুশি করতে পারি না। তার আর্থিক সামর্থ্যের শক্ত ভিতটা যেমন তাকে তৃপ্ত করে, তেমনি আমার নির্বিকার শুনে যাওয়াটা তাকে কখনো কখনো অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। তবুও সে থামে না। কোন কোন বিষয় সে রিপিট করে। আমি শুনি। শুক্রবারটা আমার কাছে মোটামুটি একটা অলস দিন। আর তার সাথে আমার দেখা হওয়াটা মূলত শুক্রবারেই ঘটে। এই দিনটায় আমি পরিচিতজনদের সাথে দেখা হলে উদারহস্তে সময় দেই। এই শুক্রবারে একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটল। যে কারণেই এই লেখা।

 

তার সঙ্গে আমার দেখা ৩০/৩১ বছর পর। প্রথম দেখাটা কবে হয়েছিল ঠিক মনে করতে পারিনা। সম্ভবত ৮৫/৮৬ সালে। আমি কলেজে পড়া সদ্য তরুণ। পশ্চিম রাজাবাজারে থাকি তখন। সেও থাকতো পশ্চিম রাজাবাজারেই। মাঝে অনেকগুলো বছর চলে গেলো। আমি অনেকটাই বদলে গেছি, সেও কম বদলায়নি। তবুও আমরা দু’জনে দু’জনকে চিনতে পেরেছিলাম। আবারো দেখা হওয়ার পর তাও তো ২/৩ বছর হয়ে গেলো। নিয়মিত বিরতিতেই তার সঙ্গে আমার দেখা হতে লাগল। এখন আবার একই পাড়ায় থাকি। সেই আশির দশকে যখন প্রথম পরিচয়, সেসময়ে কী কথা হতো এখন আর মনে করতে পারি না। তখন দেখা হলে কে বেশি কথা বলত? আমি নাকি সে, তাও মনে করতে পারি না। তবে এখন সেই বেশি কথা বলে। আমি শুনি। তার কথার বড় অংশ জুড়ে থাকে তার অর্জনের গল্প। মেয়ের বিয়ে দিয়েছে মেয়ে জামাইয়ের কি আছে কি নেই সেসব গল্প। ছেলের অর্থকড়ির গল্প। বাদ যায় না নিজের দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর গল্প। কেনাকাটার গল্প। ভবিষ্যতের স্বপ্ন সাধের গল্প। আজকাল নাকি ফ্যাশন হয়েছে ৫ কাঠা জমিতে ৫/৬ তলা বাড়ি বানিয়ে পুরোটাতেই নিজেরা থাকা। কিংবা ২ বিঘা জমিতে ১০/২০ হাজার স্কোয়ার ফুটের দোতলা বাড়িতে থাকা। এটাই এখন সামাজিক স্ট্যাটাস মাপার উপায়। আভিজাত্যের প্রতীক। তার সাথে আমার যে সময়টায় দেখা হয়েছিল তখন সামাজিক স্ট্যাটাসের তালিকায় গাড়ি, টেলিফোন, ভিসিআর, বাড়িতে বড় জোর সুইমিং পুল পর্যন্ত ছিল। এখন সেসব ডালভাতে পরিণত হয়েছে। তার বড় শখ এমন একটা বাড়ি তৈরি করে শেষ বয়সটা কাটানো। আমি তার গল্প শুনি। তার ভালো লাগার গল্প। তার ভালো থাকার গল্প। তার সাফল্যের গল্প। তার স্বপ্নের গল্প। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে আমাকে সে দুয়েকটা প্রশ্ন করে। প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। বুঝতে পারি মিলিয়ে দেখতে চায়। বুঝে নিতে চায়। আমি টের পাই তার চোখ আমার মুখে কিছু একটা খুঁজে বেড়ায়। স্বভাবগত কারণে আমি চাইলেও তাকে সবসময় খুশি করতে পারি না। তার আর্থিক সামর্থ্যের শক্ত ভিতটা যেমন তাকে তৃপ্ত করে, তেমনি আমার নির্বিকার শুনে যাওয়াটা তাকে কখনো কখনো অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। তবুও সে থামে না। কোন কোন বিষয় সে রিপিট করে। আমি শুনি। শুক্রবারটা আমার কাছে মোটামুটি একটা অলস দিন। আর তার সাথে আমার দেখা হওয়াটা মূলত শুক্রবারেই ঘটে। এই দিনটায় আমি পরিচিতজনদের সাথে দেখা হলে উদারহস্তে সময় দেই। এই শুক্রবারে একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটল। যে কারণেই এই লেখা।

কিছু নাম থাকে, যে নাম শুনে তার ধর্ম বোঝার উপায় নেই। যেমন সবুজ। সবুজ নামের মানুষটা হিন্দু হতে পারে। মুসলমান হতে পারে। এমন নামের এক ফল বিক্রেতার কাছ থেকে আমি ফল কিনে থাকি। যিনি হিন্দু। তার পাশেই আরো কয়েকজন ফল বিক্রেতার ভ্যানগাড়ি। যারা মুসলমান। এরা সবাই জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে নামাজের পর মসজিদের পাশে ফল বিক্রি করে। কারো কারো আছে সবজির দোকান। আমার ফল কেনা শেষ। তার সাথে দেখা। আমাকে প্রশ্ন করল- আপনি কি জানেন আপনি যে লোকের কাছ থেকে ফল কিনলেন ওর নাম সবুজ হলেও ও কিন্তু হিন্দু। আমি বললাম জানি তো। শ্রীকান্তের কথা বলছেন।

“আপনি ওর হিন্দু নামটাও জানেন?”

“হ্যা জানি তো।“

“আপনি জানেন কি না জানিনা, বাংলাদেশের হিন্দুরা কোন মুসলমানের দোকান থেকে কেনাকাটা করে না। হিন্দুরা নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য করে। আপনি কী এটা জানেন?”

“না, জানি না। আর এটা জানা কী এতো সহজ?”

“কঠিন কী আছে? আপনার চেনাজানা ১০/২০টা হিন্দু পরিবার, লোকজনের বাজার সদাই কেনাকাটা লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন কথাটা সত্যি কিনা।“

“আপনি যখন কোন মার্কেটে যান কেনাকাটা করার সময় আপনি কি দোকান মালিকের ধর্মীয় পরিচয় জেনে কেনাকাটা করেন? এটা কি আসলে সম্ভব?”

“কেন সম্ভব হবে না। আমি তো সবসময় পরিচিত দোকান থেকে কেনাকাটা করি। সবই মুসলমানদের দোকান।“

“বেশ। আপনি তো দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ান। শপিং করেন। ওখানে কীভাবে সেটা সম্ভব হয়? কোলকাতার রাস্তায় যে পানি পুরি খান, কিংবা মাটির ঢেলায় চা বা সেখানকার দোকান থেকে ভাবীর জন্য শাড়ি, জুতা কেনেন কিংবা নিজের জন্য ইওরোপ আমেরিকা থেকে কেনাকাটা করেন সবই কি মুসলমানদের দোকান?”

“ভাই গায়ের জোরে কথা বললে তো হবে না। বিদেশে এটা তো মেনে চলা মুশকিল।“

আমার মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি হলো। মনে হলো এই আলোচনার ইতি টানা দরকার। শেষ কথাগুলো বলেই ফেললাম- “শ্রীকান্তের পণ্যের উপর আমি আস্থা রাখি। সঠিক পণ্যটি উপযুক্ত দামে সে আমাকে দেয়। আমার সাথে তার পণ্যের লেনদেন হয়। ধর্মের নয়। সবচেয়ে বড় কথা শ্রীকান্ত আর আমি দু’জনেই বাংলাদেশী। আমরা দু’জনেই মানুষ। আর এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।“

এরপর যা ঘটল সেটা বিষ্ময়কর। তার কথা শুনে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।

“ভাই আপনি উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন। ৩০ বছর আগেও আপনার এমন অনেক নীতিকথা শুনেছি। আপনি একটুও বদলাননি। দেশ কিন্তু বদলিয়েছে। সমাজ বদলিয়েছে। আপনি আগের জায়গায় রয়ে গেছেন। তাতে কী লাভ হয়েছে? আপনার সাথে দেখা হওয়ার পর আলাপ আলোচনায় বুঝেছি মোটামুটি ফকির অবস্থাতেই আছেন। জীবনে তেমন কিছুই করতে পারেননি। আর পারবেনও না। এখনো দেশ আর সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেন। নিজের ভাগ্যই পাল্টাতে পারলেন না। দেশের ভাগ্য পাল্টাবেন? মানুষের ভাগ্য পাল্টাবেন? ব্লগ লেখেন- অঙ্গীকার শুধু দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি। আপনার এসব বা…র অঙ্গীকারের দুই পয়সা দাম আছে?…..”

আমার মনে হয়েছে এর কোন জবাব হয় না। আমি চলে এসেছিলাম। আজ থেকে ৩০ বছর আগে হলে আমি তর্কে জড়াতাম। তার তথাকথিত সাফল্যের মধ্যে কতোটা ধর্ম আছে আর কতোটা অধর্ম সেটা টেনে বের করে তাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতাম। অশুদ্ধ রাজনীতির এই দেশে চারপাশে যখন অধর্মের ছড়াছড়ি আর পঙ্কিলতায় ভরা সব কিছু, তখন কথা বাড়িয়ে কী লাভ।

ঢাকা।।
৭ জুন ২০১৮।।

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s