কয়রা থেকে ঢাকায়, অতঃপর


Koyraকয়েকদিন আগের কথা। আমি ফল কিনছিলাম ইফতারের আগেভাগে। হঠাত্‌ শুনি পাশ থেকে কেউ একজন বলছে, “আঙ্কেল আমার মায়রে একটু ইফতার কিনে দেন।”

তাকিয়ে দেখি একটা ৯/১০ বছরের ছেলে। একটু দূরে একজন মহিলা দাড়ানো। তার হাত ধরে আরেকটা বাচ্চাও সঙ্গে দাড়িয়ে আছে।

আমি তাকাতেই ছেলেটা আবারো বলল, “আঙ্কেল আমার মায়রে একটু ইফতার কিনে দেন।”

এটা একটা অসহায় মুহুর্ত। এই মুহুর্তগুলো আমার জন্য অনেক কষ্টের। এই সময়টায় আমি ভিতরে ভিতরে রাগে ফুসতে থাকি। অনেক কষ্টে রাগ ক্ষোভ দমন করতে থাকি। ক্ষোভটা নিজের উপর। সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর। আমরা এমনই একটা রাষ্ট্র তৈরি করেছি যেখানে ৯/১০ বছরের ছেলে মায়ের জন্য অন্যের কাছে  খাবার খোঁজে। একদিকে সংবাদপত্রে বড় বড় দালানকোঠা, ইমারত, অট্টালিকা, বড় বড় নির্মাণের সংবাদ অন্যদিকে রাস্তা ঘাটে, রেল, বাস স্টেশনে ক্ষুধার্ত মানুষের ভীড়। কোনটা সত্যি?

যাই হোক। আমি ছেলেটার পা থেকে মুখ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলাম। ঠিক মিলছে না। পরনে পুরনো কাপড়, কিন্তু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় চোপড়। পায়ে চপ্পল। মাথার চুলও আচড়ানো।

আমার মাথার মধ্যে হাই ভোল্টেজে সব কিছু তপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নিজের, সমাজ আর রাষ্ট্রের উপর যে ক্ষোভ সেটা তো আর শিশুদের উপর কখনো দেখাতে পারি না। আজকে মওকা হয়েছে, শিশুর মা আছে সঙ্গে।
“কি বাবা, এই বয়সেই সব কিছু শিখে নিয়েছো? কি নাম তোমার?

“রনি।”

“পুরো নাম?”

“একটাই নাম।”

“আচ্ছা। উনি তোমার মা হন?”

“জ্বী।”

“রনি আপনার ছেলে?”

“জ্বী।”

“সঙ্গের বাচ্চাটা কে?”

“জ্বী আমার মেয়ে।”

“তো আপনি আপনার ছেলেকে দিয়ে ভিক্ষা করাচ্ছেন কেন?”

“নিশ্চুপ।“

“বলেন কেন ভিক্ষা করাচ্ছেন?”

“নিশ্চুপ।”

“কাজটা কি ভালো করছেন?”

“নিশ্চুপ।“

“কি নাম আপনার?”

“মঞ্জু আরা।”

“মঞ্জু আরা শোনেন, সন্তানকে দিয়ে ভিক্ষা করানোটা ভালো নয়। এই কাজটা আর করবেন না।”

“ভাই, যা কিছু করছি বিপদে পড়ে করছি। আমার ছেলে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। গত সপ্তাহে ঢাকায় আছসি।”

“আপনার বাড়ি কোথায়?”

“থাকতাম খুলনার কয়রাতে।”

“তাহলে ঢাকায় আসছেন কেন? ”

“কাজের খোঁজে।

“ছেলের বাবা কোথায়?”

“একসাথেই এসেছি। সঙ্গে শ্বশুরও এসেছেন।”

“মানে কি? আপনারা সবাই মিলে ঢাকায় চলে এসেছেন?”

“জ্বী। দেশে কাজ নাই। অনেক সমস্যা। আমরা মাছ ধরতাম। এখন মাছ ধরতে যেতে পারি না।  আট দশ ঘরের মানুষ একসাথে ঢাকা এসেছি।“

“থাকেন কোথায়?”

“ওইদিকের এক স্কুলের বারান্দায় থাকি।“

কাজকর্ম কম, এমন মানুষের ভীড় বাড়তে থাকায় আমার মনে হলো এবার কথা বন্ধ করা দরকার। যদিও আমার এখন জানার ইচ্ছে আগের চেয়ে বেড়েছে। বললাম, “মঞ্জু আরা আপনি এতো সহজে কাজ খুঁজে পাবেননা। তাছাড়া আপনার ছেলের পড়ালেখা কীভাবে হবে? বরং বাড়িতে ফিরে যান। আপনাদের সমস্যার কথা এলাকার চেয়ারম্যান মেম্বারকে সমস্যা খুলে বলেন। তারা নিশ্চয়ই আপনাদের সাহায্য করবেন। আপনাদের সমস্যার সমাধান করবেন।”

“বাড়িতে ফিরে যাব সেই টাকাও নেই।“

আমি তার হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললাম, “এই শহর আপনাকে আপন করবে না। আপনি নিজের গ্রামে ফিরে যান। এখানে টিকে থাকা অনেক কঠিন হবে।“

অনেক চোখের কৌতুহল এড়াতে আমি তাড়াতাড়ি ওই জায়গা ছেড়ে চলে এলাম।

বাসায় এসে কয়রা নিয়ে কিছু লেখাপড়া করলাম। আপনাদের জন্য এখানে লিঙ্ক দিলাম:

http://koyra.khulna.gov.bd/

খেপুপাড়া।।
১৪ জুন ২০১৮।।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s